ইরানের সাথে যুদ্ধের ময়দানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বড় ধরনের সামরিক হামলার হুমকি দেওয়ার পর পিছিয়ে এলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনাপ্রবাহে ইরানের কৌশলগত কর্তৃত্ব বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছে। মিত্রদেশগুলোর কূটনীতির পথ খোলা রাখার আবেদনের কারণ দেখিয়ে ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেও, বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান এখন এই দ্বিধাকে তাদের অনুকূল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দেখছে।

নৌ স্নাতক বিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ আফশোন ওস্তোভার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন, "ইরান ও তার মিত্ররা পানিতে রক্তের গন্ধ পেয়েছে এবং সংঘাত বাড়িয়ে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্যেই সবার জন্য সুবিধা দেখছে।" তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তেহরানের কৌশল এখন প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ধৈর্যের পরিসমাপ্তি ঘটানো, যা প্রতিপক্ষের সংকল্পকে দুর্বল করে দেবে। ইরান মনে করে, সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই তাদের শত্রুরা দুর্বল হবে।

অন্যদিকে, ইরান তার প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে চলাচলরত জাহাজগুলোকে হুমকি দিচ্ছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালী এড়াতে বাব এল-মান্দেব প্রণালী ব্যবহারের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ইরান তার পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করলে তারাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরান ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে তাদের দূরপাল্লার অস্ত্র মাকিনি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুমোদন হ্রাসের পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ নিয়েও তার জনসমর্থনে ভাটা পড়েছে, এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও সমর্থন কমছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং পুনরায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে, তেহরান ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে পুঁজি করতে প্রস্তুত বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানান এক ইরানি কূটনীতিক। এই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে অগ্রিম হামলার বিষয়টিও বিবেচনা করবে ইরান।

এই আগ্রাসী মনোভাবের প্রমাণ মিলেছিল গত সপ্তাহে, যখন ইরান পূর্বঘোষণাহীনভাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়, যাকে সেন্ট্রাল কমান্ড "আকস্মিক আঘাতের প্রচেষ্টা" হিসেবে বর্ণনা করে। এর বিপরীতে, গত মাসে জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর ইরান ট্রাম্পের পূর্ণঘাতী যুদ্ধের লাল রেখা অতিক্রম করলেও ট্রাম্প সংযম বজায় রেখেছেন।

যদিও এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক সম্পদ রয়েছে এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অভিযান ও অর্থনৈতিক অবরোধ জারি রেখেছে, যার ফলে ইরানের অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ইরানি আক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টরের মজুত ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশের ঝুঁকি বেড়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের মজুতও তলানিতে ঠেকার পথে। বিশ্লেষকরা সতর্ করেছেন, হুমুর প্রণালী শীঘ্রই খুলে না দিলে চরম সঙ়্কট দেখা দিতে পারে। এই সমন্বিত প্রভাবে সামগ্রিক খেলার মাঠ এখন ইরনের পক্ষেই ঝুঁকে পড়েছে।

ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ডেনিস সিত্রিনোভিচ এক্সে লেখেন, "গত রাতের ঘটনাগুলি একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছে যা ক্রমশ উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠছে: আপাতত, প্রতিরোধ তৈরিতে ইরান কৌশলগত সুবিধা ধরে রেখেছে। এটি একটি পরস্পরিক প্রতিরোধের ব্যবস্থা তৈরি করতে সফল হয়েছে, যা ওয়াশিংটনের হিসাব-নিকাশকে প্রভাবিত করছে।" তিনি আরও যোগ করেন, যুদ্ধের শুরুতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করলেও ইরান প্রমাণ করে দিয়েছে যে সামুদ্রিক প্রতিবন্ধকতাপথ এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোকে জিম্মি করে বিশ্ব অর্থনীতিকে আটকে রাখার ক্ষমতা রাখে।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতে জানা যায়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি ট্রাম্পকে সরাসরি ফোন করে ইরানে নতুন করে বড় আকারে আঘাতের পরিকল্পনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং উত্তেজনা হ্রাস ও হামলা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান। এই সংবাদটি প্রথম ফরচুন.কম-এ প্রকাশিত হয়।