বাংলাদেশের বাজারে সহজলভ্য চিতল মাছের (Chitala chitala) পেছনের পাখনার ওপরের দিকে একসারি কালো দাগ দেখা যায়। এই দাগ নিয়ে অনেক লেখা এবং কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় একে 'নকল চোখ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। ক্লাউন নাইফফিশের মতো এটি প্রকৃত 'ওসেলি' বা নকল চোখ নয়, যা দেখতে চোখের মতো গোলাকার এবং চারপাশে বলয় থাকে।

বিভ্রান্তির মূল কারণ হলো চিতল এবং এর আত্মীয় ক্লাউন নাইফফিশের (Chitala ornata) মধ্যে দৃশ্যমান সাদৃশ্য। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের নদীতে পাওয়া ক্লাউন নাইফফিশের লেজের দাগ গোলাকার ও চোখের মতো, যা জীববিজ্ঞানে 'ওসেলি' নামে পরিচিত। অন্যদিকে, চিতলের দাগ তুলনামূলক অনিয়মিত এবং এর চারপাশে বলয় থাকে না। অ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই দুটি মাছ প্রায়শই গুলিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটে, যা থেকে সম্ভবত চিতলের দাগকে 'নকল চোখ' বলার ভুল প্রচলন শুরু হয়েছে।

ক্লাউন নাইফফিশের নকল চোখের কাজ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি শিকারি মাছকে বিভ্রান্ত করতে পারে। শিকারি সাধারণত মাথা লক্ষ্য করে আক্রমণ করে, কিন্তু লেজের কাছে চোখের মতো দাগ থাকলে আক্রমণ মাথার বদলে লেজের দিকে সরে যায়—একে 'ডিফলেকশন হাইপোথিসিস' বলা হয়। এটি শিকারকে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ দেয়। তবে চিতলের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।

বিজ্ঞানীদের মতে, চিতলের শরীরের কালো দাগ এবং সোনালি-রুপালি ডোরাগুলো মিলে 'ডিসরাপটিভ কালারেশন' বা ধ্বংসাত্মক রঙিনতার কাজ করে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য শিকারিকে অন্য দিকে তাক করানো নয়, বরং মাছের শরীরকে আশপাশের আলো-ছায়া, ডুবো গাছপালা ও ঘোলা পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া। এর ফলে দূর থেকে মাছটিকে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। চিতলের সোনালি ডোরাগুলো বয়স ও পানির অবস্থার ওপর নির্ভর করে কখনও স্পষ্ট, কখনও ম্লান দেখা যায়।

শুধু রং নয়, চিতলের চলাফেরার ধরনও তাকে আড়ালে রাখতে সাহায্য করে। এর লম্বা পায়ু-পাখনা লেজের পাখনার সঙ্গে মিলে প্রায় একটানা ফিতা তৈরি করে, যা ঢেউ তুলে সামনে বা পেছনে চলাচল করতে পারে। শরীর খুব বেশি না নড়িয়েই মুহূর্তের মধ্যে দিক পরিবর্তন করতে পারে সে, ফলে পানির ভেতরে চলাফেরা হয় নীরব ও মসৃণ।

চিতলের আরেকটি বিশেষ অভিযোজন হলো এর বায়ুথলি। এটি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যে প্রয়োজন হলে মাছটি বাতাস গিলেও অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। গ্রীষ্মকালে খাল-বিলের পানিতে অক্সিজেন কমে গেলেও তাই চিতল তুলনামূলক ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।

একই গণের এই দুটি মাছের বাঁচার কৌশল আলাদা। ক্লাউন নাইফফিশের চোখের মতো দাগ শিকারির আক্রমণ ভিন্ন দিকে সরিয়ে দিতে পারে, যেখানে চিতলের কালো দাগ, ডোরা ও শরীরের গঠন তাকে পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকতে সাহায্য করে। তবে এই প্রাকৃতিক কৌশলগুলো আজ মানুষের কার্যকলাপের সামনে খুব একটা কাজে আসছে না। বাঁধ নির্মাণ, নদী-খালের আবাসস্থল নষ্ট, দূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে বাংলাদেশের জলাশয়ে চিতলের সংখ্যা দ্রুত কমছে।