অ্যান্টার্কটিকার বরফাচ্ছন্ন প্রান্তরে পিরামিডের মতো দেখতে একটি পাহাড়কে ঘিরে সম্প্রতি ফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। ভাইরাল রিলসে দাবি করা হচ্ছে, মিসরের মতোই সেখানেও নাকি পিরামিড অবস্থিত। তবে প্রকৃতপক্ষে এই তত্ত্বের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই সময় উপগ্রহ থেকে তোলা একাধিক চিত্রে বরফে ঢাকা পিরামিড সদৃশ একটি পাহাড় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই ছবিগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তা নানা কল্পকাহিনির জন্ম দেয়। কেউ ধারণা করতে শুরু করেন, হাজার হাজার বছর আগে বুঝি এই দুর্গম শীতল অঞ্চলে কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা বিদ্যমান ছিল; আবার কেউ সরাসরি ভিনগ্রহের প্রাণীদের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেন বিষয়টিকে।
তবে বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এই ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিকোলস কলেজের পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাউরি পেল্টো জানান, মানুষের নজরে আসার অনেক আগেই গবেষকদের কাছে পর্বতটি পরিচিত ছিল। কারণ এর দক্ষিণ দিকে ‘প্যাট্রিয়ট হিলস’ নামের এক গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে, যেখানে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা নিয়মিত গবেষণা চালান এবং সেখান থেকেই চোখে পড়ে এই ভিন্নধর্মী ভূমিরূপ। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আকৃতির পেছনে মানুষ বা ভিনগ্রহের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে বরফ জমা ও গলে যাওয়ার প্রক্রিয়া এবং বায়ুপ্রবাহের কারণে শিলার ধীরে ক্ষয় পাওয়ার প্রাকৃতিক পদ্ধতির মাধ্যমে।
প্রাতিষ্ঠানিক কোনও নাম না থাকা এই পর্বতশৃঙ্গটি মার্কিন বৈমানিক লিংকন এলসওয়ার্থের নামে নামাঙ্কিত দক্ষিণ এলসওয়ার্থ পর্বতশ্রেণির অন্তর্গত 'হেরিটেজ রেঞ্জ'-এর একটি অংশ। ১৯৩৫ সালে উড়োজাহাজে করে অতিক্রম করার সময় তিনিই সর্বপ্রথম এটির সন্ধান পান। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে-র ২০০৭ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এই পর্বতমালায় এমন অনেকগুলো ধারালো ও খাঁজকাটা চূড়া ছড়িয়ে আছে। পিরামিডের মতো দেখতে এই পর্বতের উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ১৫০ ফুট বা ১ হাজার ২৬৫ মিটার। এর উচ্চতা, উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ডেনালির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের বিবেচনায় এলাকাটি অত্যন্ত মূল্যবান; এখানে আনুমানিক ৫০ কোটি বছর পুরনো ক্যামব্রিয়ান যুগের ট্রাইলোবাইটসহ বিভিন্ন প্রাচীন জীবাশ্মের সন্ধান মিলেছে।
অ্যান্টার্কটিকা ছাড়াও বিশ্বের আরও কিছু জায়গায় এমন প্রাকৃতিক পিরামিড আকৃতির পর্বত দেখা যায়। পেরুর আন্দিজ পর্বতের ‘কর্ডিলেরা ব্লাঙ্কা’ শ্রেণির আলপামায়ো শৃঙ্গটি প্রায় ২০ হাজার ফুট উচ্চতায় বরফের কৌণিক গঠনের জন্য গিজার পিরামিডের মতো দেখায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর পিরামিড পর্বত তৈরি হয়েছে প্রাচীন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে, যেখানে বরফ ও লাভার পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে এই বিশেষ আকৃতির উদ্ভব ঘটে। ইউরোপের বুলগেরিয়ায় পিরিন পর্বতের চূড়াগুলোও হিমবাহের জমাট বাঁধা ও গলনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পিরামিডের মতো কৌণিক রূপ ধারণ করেছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে, এগুলো সবই প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টি, কোনো রহস্য নয়।




