হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এক অভিযানে বিরল প্রজাতির পাখি তুষার-ভ্রু চটকের দেখা মিলেছে। পক্ষী আলোকচিত্রী ডা. শাহেনশাহ বাপ্পি ও গাইড প্রসেনজিৎ দেববর্মার তাগিদে একটি ছোট পুকুরের পাড়ে গিয়ে এই পাখির সন্ধান পান বিশেষজ্ঞরা। সকাল ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত টাওয়ারে বিরল পাখির ছবি তোলার পর দুপুরের খাবার শেষে বিশ্রামের সময়ও তাঁরা পাখি পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে পড়েন। বন বিভাগের প্রয়াত ফরেস্ট রেঞ্জার মুনির আহমেদের পরামর্শে সেই পুকুরটি তৈরি করা হয়েছিল শীতকালে পানি সংকটে পশুপাখির কষ্ট লাঘবের জন্য। সেখানে বসামাত্রই শ্বেতশুভ্র পাহাড়ি দুধরাজের দেখা মেলে। এরপর দেড় ঘণ্টায় আরও ১১টি পাখি দেখা যায়, যার মধ্যে দুই প্রজাতির নতুন পাখি ছিল। আলো কমার সঙ্গে সঙ্গে পাখির আনাগোনা বাড়তে থাকে এবং পরবর্তী ৩৭ মিনিটে আরও সাতটি পাখির দেখা পাওয়া যায়, যার পাঁচটিই ছিল নতুন ও বিরল। এত অল্প সময়ে এত নতুন পাখির ছবি তোলা বিরল ঘটনা বলে মন্তব্য করেন পর্যবেক্ষকরা। বেলা ৩টা ৬ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে চমৎকার স্বরে গান গাইতে গাইতে তুষারের মতো শ্বেতশুভ্র ও চওড়া ভ্রুওয়ালা নীল-কমলা পাখিটি বেরিয়ে আসে, যা কখনো ভোলার নয়। ঝোপ থেকে বেরিয়ে প্রথমে পানিতে না নামলেও চুপচাপ বসে থাকায় পাখিটি সাহস পায় এবং কাছাকাছি এসে গোসল করে। পুকুরটি সাধারণত ছোট পুকুর নামে পরিচিত থাকলেও সেদিন থেকে এর নাম রাখা হয় ‘পুণ্যি পুকুর’। ৬ মার্চ ২০১৮ সালের ঘটনায় দেখা পাওয়া পাখিটি ছিল পুরুষ। স্ত্রী পাখিটির দেখা পেতে একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। শ্বেতশুভ্র ও চওড়া ভ্রুর নীল-কমলা পাখিটি দেশের বিরল পরিযায়ী তুষার–ভ্রু চটক। ইংরেজি নাম স্নোয়ি-ব্রাউড ফ্লাইক্যাচার। Muscicapidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ficedula hyperythra। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। দৈর্ঘ্যে মাত্র ১১ সেন্টিমিটার ও ওজনে ৯ গ্রাম। পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে সম্পূর্ণ আলাদা। পুরুষের দেহের ওপরটা ধূসরে-নীল ও নিচটা লালচে-কমলা, ভ্রুরেখা প্রশস্ত ও তুষারের মতো সাদা, ডানা লালচে-বাদামি, বগল কালচে, থুতনি কালো, গলা ও বুক লালচে-কমলা, লেজ নীল ও গোড়া সাদা। স্ত্রীর দেহের ওপরটা জলপাই-বাদামি, গলা-বুক ঘিয়ে-সাদা ও বাকি অংশ ময়লা ঘিয়ে-কমলা, ভ্রুরেখা ও চোখের চারদিক কমলা-পীতাভ। উভয়ের চোখ বাদামি ও ঠোঁট কালো, পা ও নখ নীলচে-কালো ও ধূসর। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের ওপরটায় কালচে-বাদামির ওপর হলদে ছোপ এবং বুক-পেট কমলাটে, বাদামি আঁশ-ছোপে ঢাকা। শীতে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে দেখা যায়। কদাচ ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের পাতাঝরা বনেও দেখা মেলে। আর্দ্র ঘন জঙ্গলের নিচু ঝোপঝাড় ও বাঁশবনে বিচরণ করে। সাধারণত একাকী বা জোড়ায় থাকে। ঘন ঝোপঝাড় ও স্যাঁতসেঁতে লতা-গুল্ম ও উপড়ে পড়া গাছের ডালপালার মাঝে কীটপতঙ্গ, কেঁচো ও ছোট ফল খায়। ‘ট্সিট-সিট্-সি-সিট্—’ বা ‘সিইই...সিইই...সি-সি...ইইই...সিট্’ স্বরে ডাকে। এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। পাহাড়ের ঢালে পাথরের মধ্যে বা গাছের গোড়ায় কাপের মতো ছোট বাসা বানায়। ফিকে ধূসরাভ বা বাদামি-সাদার ওপর লালচে-বাদামি ছিটযুক্ত তিন-চারটি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটতে কত দিন লাগে জানা যায়নি, তবে স্ত্রী-পুরুষ মিলে তা দেয় ও ছানা লালন-পালন করে। আয়ুষ্কাল ২-৩ বছর, তবে ৮-৯ বছর পর্যন্ত বাঁচার রেকর্ড আছে। পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ ও গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ন ম আমিনুর রহমান এই তথ্য জানিয়েছেন।
হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বিরল তুষার-ভ্রু চটকের দেখা মিলল
হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বিরল পরিযায়ী পাখি তুষার-ভ্রু চটকের দেখা মিলেছে। ২০১৮ সালের মার্চে পাখিটি প্রথমবারের মতো ছবি তোলা হয়। এর বৈশিষ্ট্য ও জীবনধারা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন পাখি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আ ন ম আমিনুর রহমান।




