মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইরান ধারাবাহিক চাপের মুখে পড়লেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নয়, তবে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা ক্রমশ কমে আসবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই শূন্যতা পূরণের জন্য এগিয়ে আসছে তুরস্ক ও তার নেতৃত্বে গঠিত একটি সুন্নি জোট।
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নব্য-উসমানীয় দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরবের মধ্যে যে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা ‘আর৪’ নামে পরিচিত। এই জোটের লক্ষ্য হলো দুর্বল হয়ে পড়া শিয়া অক্ষের পরিবর্তে একটি সুন্নি সংহতির অক্ষ তৈরি করা। তবে জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও সুস্পষ্ট। এরদোয়ান নিজেকে সমগ্র সুন্নি বিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান, যেখানে তুরস্ক থাকবে শীর্ষে। অন্যদিকে সৌদি আরব নিজেদের মক্কা ও নবী মুহাম্মদের উত্তরসূরি মনে করে নেতৃত্ব দাবি করছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা জোটের কার্যকারিতায় প্রশ্ন তুলছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘আর৪’ জোটে কোনো মধ্য এশীয় বা তুর্কি রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এসব দেশ প্রতিবেশী আফগানিস্তানের কারণে ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক। এছাড়া ভারত ও ইসরায়েলের সাথে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। চীনের প্রভাবে পাকিস্তানের বন্দর ব্যবস্থাপনা থাকায় এই অঞ্চলের দেশগুলো বাণিজ্যের জন্য ভারতকেই বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করে। ফলে মধ্য এশিয়ার তুর্কি রাষ্ট্রগুলো মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতি থেকে দূরেই থাকতে চায়।
ইরানের প্রভাব হ্রাস পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে কুর্দি বিষয়ক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। উভয় দেশই কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। সিরিয়া ইতিমধ্যে তুরস্কের নব্য-উসমানীয় প্রভাবের আওতায় চলে এসেছে, যা আগে ইরানের শিয়া প্রভাবাধীন ছিল। ইরাকেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সেখানে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের অর্থায়নের জবাবে তুরস্ক স্থানীয় গোত্র ও কুর্দিদের সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতি বিরোধী অভিযান ইরানের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে সহায়ক হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক হোয়াইট হাউস সফরও এই ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এরদোয়ানের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিনি হামাসের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে ইসরায়েলের বিরাগভাজন হয়েছেন। ইসরায়েল তার জবাবে গ্রিস ও গ্রিক সাইপ্রাসের সাথে সামরিক জোট আরও শক্তিশালী করছে, যার মধ্যে রয়েছে যৌথ সামরিক মহড়া ও অত্যাধুনিক অস্ত্র ভাগাভাগি। তবে গ্রিক সমাজ সাধারণত আরবপন্থী ও বামপন্থী হওয়ায় এই জোট জনমনে ততটা সমর্থন পাচ্ছে না। ইসরায়েলের জন্যও তুরস্ক ন্যাটো সদস্য হওয়ায় সরাসরি সংঘর্ষে যাওয়া কঠিন।
ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। ওয়াশিংটন নানা ছাড় দিলেও তেহরান যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা কমাতে রাজি হচ্ছে না। এর পেছনে অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ট্রাম্প প্রশাসনের দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা, শিয়া শক্তির পুনরুত্থানের আশা এবং রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুত সমর্থন—একাধিক কারণ কাজ করছে। ইরান মনে করে, স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলে তাদের শাসনব্যবস্থার পতন ত্বরান্বিত হবে।
সামগ্রিকভাবে, ইরানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা তার আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস করবে। এরদোয়ানের উত্থান অব্যাহত থাকলেও তার বয়স ৭২ বছর এবং সুস্থতাও ভালো নয়। উত্তরসূরি স্পষ্ট নয়। খারাপ অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে তিনি ন্যায্য নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব কমার সাথে সাথে তুরস্ক ক্রমশ চীনের দিকে ঝুঁকছে। তবে এই সব পরিবর্তন মসৃণ ও দ্রুত হবে না, বরং অঞ্চলে অস্থিরতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়তে পারে।




