যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের অবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর। পেনসিলভানিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রতিরক্ষা ও উদ্ভাবনবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের উদ্দেশে বলেন, তাদের অস্ত্রের মান বিশ্বসেরা হলেও উৎপাদনের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, যিনি এই যুদ্ধ-সক্ষমতাকে 'স্বাধীনতার রক্ষাকবচ' হিসেবে বর্ণনা করেন।
'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামে পরিচিত এই অভিযানে টানা প্রায় ৪০ দিন ইরানে জোরাল সামরিক হামলা চালানো হয়। হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে, এতে এখন পর্যন্ত ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, যার সিংহভাগ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে ব্যয় হয়েছে। মার্কিন বাহিনী ইরানজুড়ে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং ইরানের ছোড়া ১,৭০০-এর বেশি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, আলোচনার সুযোগ তৈরি করতেই ইরানে হামলা স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অস্ত্রভান্ডার আরও খালি হয়ে পড়ার আশঙ্কায় তাঁকে নতুন করে সংঘাত না বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সম্প্রতি সিনেটের অর্থ বরাদ্দ কমিটিকে জানিয়েছেন, জরুরি ঘাটতি মেটাতে পেন্টাগনের আরও ৮৭ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য বলছে, এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। সিএসআইএসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ানের মতে, এক হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে এবং ২০৩১ সালের আগে এই মজুত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা আনুমানিক ২,৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১,৪৩০টি ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার, অথচ ইরানের ড্রোনগুলোর উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার।
একইসঙ্গে 'টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স' বা থাড নামের আরেকটি অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ব্যবহার করা হয়েছে, যার সরবরাহ আগে থেকেই সীমিত ছিল। সিএসআইএসের হিসাবমতে, যুদ্ধ শুরুর আগে থাকা ৩৬০টি থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৯০ থেকে ২৯০টি ইতিমধ্যে ছোড়া হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৯টি থাড ব্যাটারি সচল রয়েছে, যার ৭টি যুক্তরাষ্ট্রের।
এই অস্ত্রঘাটতির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে 'ডেভিডসন উইন্ডো' নামে পরিচিত সময়সীমার প্রেক্ষাপটে। ২০২১ সালে কংগ্রেসের এক শুনানিতে অ্যাডমিরাল ফিলিপ ডেভিডসন সতর্ক করে বলেছিলেন, ছয় বছরের মধ্যে চীন তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে। সিআইএর সাবেক পরিচালক উইলিয়াম বার্নসও ২০২৩ সালে একই পূর্বাভাস দেন। কানসিয়ানের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো সংঘাত শুরু হলে মার্কিন বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় ও পছন্দের অস্ত্রের পর্যাপ্ততা থাকবে না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, যুক্তরাষ্ট্র মাসে বড়জোর ৬০ থেকে ৬৫টি এবং বছরে ৭০০ থেকে ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, অথচ অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম দিনেই ৮০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ইউক্রেনের জন্যও সম্পদের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও অস্ত্রের মজুত রয়েছে। এদিকে, ইরানের নিজস্ব অস্ত্রের অবস্থা আরও শোচনীয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান'-এর নীতিবিষয়ক পরিচালক জেসন ব্রডস্কির মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের হাতে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।




