আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে এই আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। তবে আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন ও মালদ্বীপ সফর শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি ঢাকায় ফিরেছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৪ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠান। এতে তিনি বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। উল্লেখ্য, ব্রিকস উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট এবং বিমসটেক বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সহযোগিতা জোট। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া—এই ১১ দেশ ব্রিকসের সদস্য।
ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের শীর্ষ সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং ‘মানবতাই সবার আগে’ নীতির আলোকে সহযোগিতা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক বিষয়েও মতবিনিময়ের সুযোগ থাকবে। নরেন্দ্র মোদি আশা প্রকাশ করেছেন যে, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ ‘ব্রিকস আউটরিচ’ পর্বের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়া শুধু একটি বহুপক্ষীয় বৈঠকে উপস্থিত থাকার প্রশ্ন নয়। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে এবং এ বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর সমর্থনও চেয়েছে। চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ পেয়ে আসছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ এবং ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস আউটরিচে বাংলাদেশ অংশ নেয়। তবে ২০২৫ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকসভুক্ত অধিকাংশ দেশের শীর্ষ নেতার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বহুপক্ষীয় এই ফোরামের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন মনে করেন, কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহী। সে বিবেচনায় আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটি নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সম্ভাব্য প্রথম বৈঠকের সুযোগও তৈরি করতে পারে। তিনি বহুপক্ষীয় এই ফোরামের সুযোগ বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত বলে মত প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আসবে, প্রধানমন্ত্রী যাবেন কি না। গেলে অনেকের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং এ নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তাও শুরু হয়নি বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে জনপরিসরে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তাতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি। সীমান্তে ভারতের পুশ-ইনের অব্যাহত চেষ্টা, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন মন্তব্য এবং সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার ইচ্ছা প্রকাশ—সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে ধারায় এগিয়েছে, নির্বাচনের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের প্রশ্নে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও সরকারের বিবেচনায় থাকতে পারে। একই সঙ্গে নয়াদিল্লিতে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হলে, দেশের রাজনৈতিক ও জনমতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যে গতিতে এগোনোর প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। তাঁর মতে, এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে এবং ভারতও সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে আগ্রহী।




