হাইকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে স্পষ্ট জানিয়েছে, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের আইনগত দায়িত্ব মা-বাবার মধ্যে চলমান কোনো বৈবাহিক বিরোধের কারণে এড়ানো সম্ভব নয়। বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৬ জুন এ বিষয়ে রায় প্রদান করেন। সম্প্রতি ২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি হাতে পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানিয়েছেন।

মামলার ঘটনা প্রবাহ থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এক দম্পতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে দাম্পত্য কলহের কারণে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেন বলে দাবি করেন। এ অবস্থায় স্ত্রী দেনমোহর ও নাবালক কন্যাসন্তানের ভরণপোষণের জন্য আদালতে মামলা দায়ের করেন। পারিবারিক আদালতে তালাকের বিষয়টি প্রমাণে ব্যর্থ হন স্বামী। অধস্তন আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি জারি করে।

এরপরে স্বামী একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করেন, যাতে তিনি দাবি করেন যে তালাক ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। এই মামলার অজুহাতে তিনি ভরণপোষণের ডিক্রি বাস্তবায়ন স্থগিতের আবেদন করেন। তবে অধস্তন আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। ২০২৩ সালে স্বামী হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করে এবং চূড়ান্ত শুনানির পর গত ১৬ জুন রুল ডিসচার্জ করে রায় প্রদান করে। ফলে অধস্তন আদালতের পূর্বের সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।

হাইকোর্ট তার রায়ে স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ আইনানুযায়ী পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। নথি ও তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত পর্যবেক্ষণ করে, ডিক্রিতে স্বামীর ওপর যে দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছিল, তা তিনি পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। নির্ধারিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ অর্থও পরিশোধ করা হয়নি। একইভাবে তিনি নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের চলমান আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

রায়ে আরও বলা হয়, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার একটি স্বতন্ত্র সংবিধিবদ্ধ ও আইনগত অধিকার। এই অধিকার মা-বাবার মধ্যে বৈবাহিক বিরোধ আছে কি না, তা থেকে উদ্ভব হয় না এবং এর ওপর নির্ভরশীলও নয়। তালাক বৈধ বা কার্যকর হয়েছে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের আইনগত দায়িত্ব বাবার ওপর বর্তায়। তাই বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিরোধের অজুহাত দেখিয়ে স্বামী আইনগতভাবে তার নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ রাখতে পারেন না।

স্বামী বারবার দাবি করে এসেছেন যে তিনি আগেই কার্যকরভাবে তালাক দিয়েছেন। আদালত এ প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে, বিচারিক আদালতে কথিত তালাক প্রমাণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। আপিল আদালতও এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করেননি, যেখানে তালাকের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি হাইকোর্ট বিভাগ থেকেও স্বামীর পক্ষে এ মর্মে কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি যে কথিত তালাক আইনানুযায়ী বৈধ হয়েছে। ফলে এ ধরনের দাবির কোনো আইনগত কার্যকারিতা নেই।

আদালত আরও বলেছেন, কথিত তালাক আইনানুযায়ী প্রমাণিত হয়নি বা অন্য কোনো কারণে আইনগতভাবে অকার্যকর বিবেচিত হয়েছে। ফলে তা বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটিয়েছে বলে গণ্য করা যায় না। আইনগতভাবে অকার্যকর এমন তালাক, আইননির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে পরে বা নতুন করে তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে না।

আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম। অন্যদিকে স্ত্রীর পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান শুনানি করেন। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও ইফাত হাসান শাম্মি। আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, এই রায়ে তিনটি মূল নীতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে—প্রথমত, তালাকের আইনগত কার্যকারিতা অবশ্যই আইন অনুযায়ী প্রমাণিত হতে হবে; দ্বিতীয়ত, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন অধিকার; এবং তৃতীয়ত, নতুন মামলা করে চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়ানো যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই রায় নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে তার অভিমত।