বাংলাদেশ বর্তমানে গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সম্মুখীন। এই সংকটের অন্যতম দিক হলো 'পোস্ট-ট্রুথ' বা সত্য-উত্তর যুগের আবির্ভাব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সমাজে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার সীমারেখা প্রায় অস্পষ্ট হয়ে গেছে। পোস্ট-ট্রুথ এমন একটি সামাজিক অবস্থা যেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের তুলনায় আবেগ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস জনমত গঠনে বেশি প্রভাব ফেলে। লেখক অধ্যাপক এলিনা গরোখোভা তাঁর 'আ মাউন্টেন অব ক্রাম্বস' গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, নেতারা মিথ্যা বলেন, জনগণ জানেও যে তাঁরা মিথ্যা বলছেন, তবু উভয় পক্ষই এই নাটক চালিয়ে যায়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তার প্রথম মেয়াদে তিনি ৩০ হাজারের বেশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছিলেন, যা তার জনপ্রিয়তা কমাতে পারেনি। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের পছন্দ-অপছন্দ বিশ্লেষণ করে তাদের সামনে এমন কনটেন্ট উপস্থাপন করে যা তাদের বিশ্বাসকে পুনর্বহাল করে। এর ফলে ইকো চেম্বার তৈরি হয় এবং বিপরীত মতের সাথে বিতর্কের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। মানুষ তখন কেবল নিজের বিশ্বাসের সাথে মেলে এমন তথ্যই দেখতে পায়, যা কনফার্মেশন বায়াসকে আরও শক্তিশালী করে। আরও বিপজ্জনক হলো ব্যাকফায়ার ইফেক্ট, যেখানে ভুল প্রমাণ করলেও মানুষ নিজের বিশ্বাসকে আরও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো গুজব সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পুরোনো ভিডিও বা ছবি ব্যবহার করে নতুন ঘটনার নামে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আরও বেড়ে যাচ্ছে। নজরদারি পুঁজিবাদের অধীনে আমাদের আবেগ ও ডেটা ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হয়েছে। টেক জায়ান্টরা আমাদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে গোষ্ঠীভিত্তিক সত্য তৈরি করে দিচ্ছে। অনলাইনে পেইড গ্রুপ কাজ করছে দেশের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে। তাদের কাজ মিসইনফরমেশন ছড়ানো এবং গুজব সৃষ্টি করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা জরুরি। সেন্সরশিপ নয়, বরং একটি সহিষ্ণু ও চিন্তাশীল নাগরিক সমাজই পোস্ট-ট্রুথের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। হান্নাহ আরেন্টের ভাষায়, এই চিন্তাহীনতার পরিস্থিতি আমাদের সাংঘাতিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেমনটি নাৎসি জার্মানিতে দেখা গিয়েছিল। তাই সত্য-উত্তর বাস্তবতায় দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে মানুষকে যুক্তি দিয়ে মতভেদ করতে শিখতে হবে এবং বিদ্বেষ থেকে বিরত থাকতে হবে।