রান্নার জন্য স্বাস্থ্যকর বিকল্প খুঁজতে গিয়ে অনেক পরিবার এখন সয়াবিন তেলের বদলে সরিষার তেলের দিকে ঝুঁকছেন। তবে এই তেলের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বিপুল পরিমাণে নয় বলে মনে করেন চিকিৎসকরা; বরং তাঁদের মতে, যেকোনো তেলের ক্ষেত্রেই সংযত ব্যবহারই সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল।
স্বাদের দিক থেকে সরিষার তেলের তুলনা নেই। একটি সাধারণ আলুভর্তাও এতে রান্না করলে খাবারের টেবিলে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে, আর বিকেলের মুড়িমাখা হয়ে ওঠে বিশেষ আকর্ষণ। কিন্তু পুষ্টি উপাদানের বিচারে বিষয়টি জটিল। ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সয়াবিন তেলের তুলনায় সরিষার তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ অনেক কম এবং মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে। অন্যদিকে, পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড—অর্থাৎ ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড—এর মাত্রা সরিষার তেলে অপেক্ষাকৃত কম। সয়াবিন তেলে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড যথেষ্ট বেশি থাকলেও ওমেগা-৩-এর পরিমাণ তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। এই ফ্যাটি অ্যাসিডের অনুপাতের কারণে সরিষার তেল হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে; এটি রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। বর্তমান খাদ্যাভ্যাসে আমরা বিভিন্ন খাবার থেকেই ওমেগা-৬ পেয়ে থাকি, তাই পুষ্টি উপাদানের সামগ্রিক ভারসাম্যে সরিষার তেলকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
তবে সরিষার তেলের সঙ্গে একটি মূল বিতর্ক জড়িত, তা হলো এতে উপস্থিত ইরুসিক অ্যাসিড। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাণীদেহে এই উপাদান নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং হৃৎপিণ্ডের কোষে চর্বি জমার কারণ হতে পারে। যদিও মানুষের ক্ষেত্রে এমন ক্ষতির সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি। তার পরও যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) রান্নায় সরিষার তেল ব্যবহারের অনুমোদন দেয়নি। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যরাষ্ট্রে ইরুসিক অ্যাসিডের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা বেঁধে দেওয়া আছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সরিষার তেল রান্নার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, এবং তাদের মাঝে বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপক কোনো প্রমাণ দেখা যায়নি। বিজ্ঞান এখনো এই তেল পুরোপুরি নিরাপদ না ক্ষতিকর, সে প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেনি। ফলে, বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, মাঝেমধ্যে স্বাদ নেওয়ার মানসিকতা নিয়ে সরিষার তেল ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই হতে হবে পরিমিত।
শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন সরিষার তেলে রান্না করা খাবার না দেওয়াই শ্রেয়, সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানোর স্বার্থে। তবে বাঙালি রন্ধনশৈলীর এই অতুলনীয় স্বাদ থেকে নিজেকে পুরোপুরি দূরে রাখাও জরুরি নয়। খাঁটি সরিষার তেল নির্বাচন করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, কারণ ভেজাল তেল নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
সেই সঙ্গে, তেল যতই স্বাস্থ্যকর ও নির্ভেজাল হোক না কেন, দৈনিক মোট তেল গ্রহণের পরিমাণ চার থেকে পাঁচ টেবিল-চামচের সীমা অতিক্রম না করাই উচিত। বিশেষজ্ঞ আরও কিছু সতর্কতা জুড়ে দিয়েছেন: যাদের পরিপাকতন্ত্র সংবেদনশীল, তাদের জন্য ঝাঁজালো এই তেল পেটের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। হৃদ্রোগ, যকৃতের রোগ, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি সমস্যায় ভোগা ব্যক্তি বা গর্ভবতী নারীদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা তৈরি করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। সরিষার তেলে অ্যালার্জি থাকলে তা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে।

