বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক তহবিল (ইউএনএফপিএ) পরিচালিত ‘ডেমোগ্রাফিক ফিউচার সার্ভে’র ফলাফলে তরুণদের স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে এসেছে। ৭৩টি দেশের প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর চালানো জরিপটি বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক তথ্য সরবরাহ করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ, যার সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ। প্রক্ষেপণ অনুসারে, এই গোষ্ঠীর আকার ২০৩৬ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। দেশের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড়, ডিজিটালি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং সর্বোচ্চ শিক্ষিত প্রজন্ম। তবে তরুণীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন, কারণ দেশের প্রায় অর্ধেক মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
জরিপে দেখা গেছে, তরুণ-তরুণীদের প্রধান আকাঙ্ক্ষা হলো আর্থিক নিরাপত্তা, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিবার গঠনের সুযোগ। দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন এবং অনুরূপ সংখ্যক তরুণ বিবাহ করতে আগ্রহী। প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৮ জন মনে করেন, সন্তান সংসারে যে আনন্দ বয়ে আনে, সেটিই মা-বাবা হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। অন্যদিকে, ৮৮ শতাংশ তরুণ আর্থিক নিরাপত্তাকে সন্তান ধারণের পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, ৮৭ শতাংশ স্থায়ী চাকরির গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন এবং অর্ধেকের বেশি অর্থনৈতিক ও আবাসন সংকটকে প্রধান বাধা বলে মনে করেন।
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনো ৪৭ শতাংশ, যা কিশোরীদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি হাজার নারীর মধ্যে ৯২ জন ইতিমধ্যে মা হয়েছেন। শৈশব ও কৈশোরে গর্ভধারণ মা ও শিশু উভয়ের জন্য মৃত্যু ও অক্ষমতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বব্যাপী নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের প্রতি চারটি মৃত্যুর একটি মাতৃত্বকালীন জটিলতার কারণে ঘটে।
নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪-এর তথ্য অনুসারে, কিশোরী ও তরুণীরা যেকোনো বয়সগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার। এই সহিংসতাই মেয়েদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ এবং কর্মক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ। বর্তমানে প্রযুক্তি-সহায়ক সহিংসতা একটি নতুন ও ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের নারীরা বছরে ৫.১৯ ট্রিলিয়ন টাকা সমমূল্যের অবৈতনিক গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজ করেন, যা জিডিপির ১৫ শতাংশ এবং মোট অবৈতনিক কাজের ৮৪ শতাংশ। জরিপে এই সেবামূলক কাজের ক্ষেত্রে জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য পুনরায় নিশ্চিত হয়েছে। বর্তমানে ১৫-২৯ বছর বয়সী প্রতি পাঁচজন তরুণের একজন শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন, যেখানে তরুণীদের হার আরও বেশি।
জনমিতিক লভ্যাংশের এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের নতুন জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ও পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত পরিকল্পনায় (২০২৬-২০৩০) এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নির্ভরশীলতার অনুপাত ১.০৬৮, যা ২০৪২ সালের দিকে ১.১২৬-এ পৌঁছাবে এবং দুই দশক ধরে দ্রুত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করবে। কিন্তু নারী ও কন্যাশিশুদের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া এই লভ্যাংশ অর্জন সম্ভব নয় বলে নীতিতে স্বীকার করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধ, কিশোর-কিশোরীদের জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলা এবং সেবামূলক কাজের পুনর্বণ্টনের মতো পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইউএনএফপিএ’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং বলেন, তরুণদের মধ্যে ইচ্ছা ও সম্ভাবনা আগে থেকেই আছে, এখন প্রয়োজন সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। তিনি উল্লেখ করেন যে, একটি দেশের অগ্রগতি কতজন শিশু জন্ম নিচ্ছে তা দিয়ে নয়, বরং প্রতিটি তরুণ ও কন্যাশিশু তাদের পছন্দমতো পরিবার ও ভবিষ্যৎ গড়তে পারছে কিনা তা দিয়ে বিচার করা উচিত। ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ সরকার, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে তরুণদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে।




