গত রোববার রাতে পায়রা সমুদ্রবন্দরের পূর্ব-দক্ষিণে গভীর বঙ্গোপসাগরে একটি মাছ ধরার ট্রলার হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। ট্রলারটিতে আল আমিনসহ মোট এগারোজন মাঝিমাল্লা ছিলেন। দুর্ঘটনার পর সোমবার পাঁচজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। বুধবার সন্ধ্যায় ভোলার ঢালচর নদ এলাকা থেকে স্থানীয় জেলেরা আল আমিনকে উদ্ধার করেন। তিনি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ইছাদী গ্রামের মৃত চান মিয়া হাওলাদারের ছেলে।

উদ্ধারের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আল আমিনকে পটুয়াখালীতে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। লবণাক্ত পানি পেটে ঢুকে পড়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর ছিল। বর্তমানে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুঠোফোনে আল আমিন ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি বলেন, রোববার রাত দশটার দিকে তাঁরা জাল ফেলার কাজ করছিলেন। হঠাৎ তীব্র বেগে বাতাস বইতে শুরু করলে ট্রলারটি উল্টে যায় এবং ডুবে যায়। ট্রলারের বাইরে থাকায় আল আমিন, মালিক এমাদুল সিকদার, হারুন মিয়া, আকাশ, রাকিব, শাকিল, নাজমুল ও বায়জীদ সহজে বের হতে পেরেছিলেন। তবে তাঁর আত্মীয় ফোরকান হাওলাদার, ফোরকানের ছেলে সায়েম ও পানপট্টি এলাকার এবাদুল কেবিনের ভেতরে আটকা পড়েন এবং বের হতে পারেননি।

উত্তাল সাগরে একপর্যায়ে এমাদুল সিকদার, নাজমুল, বায়জীদ, শাকিল ও রাকিব অন্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আল আমিন, হারুন ও আকাশ ডুবে যাওয়া ট্রলারের একটি অংশ এবং একটি ফিশিং বয়া ধরে ভেসে থাকতে থাকেন। দুই দিন পর উল্টে থাকা ট্রলারের কেবিন থেকে ফোরকান ও এবাদুলের মরদেহ বের হয়ে সাগরে ভেসে যেতে দেখেন তাঁরা। আল আমিন জানান, এই দৃশ্য দেখে তিনি কাঁদতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু পরে কান্না চেপে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যান।

আল আমিন আরও বলেন, ঢেউয়ের মধ্যে একপর্যায়ে হারুন ও আকাশের কাছ থেকেও তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর একটি ছোট ফিশিং বয়া পেটের নিচে চেপে ধরে একাই ভেসে থাকেন। ক্ষুধা ও পিপাসায় দুর্বল হয়ে জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভাসতে ভাসতে বুধবার সন্ধ্যায় ভোলার ঢালচর নদ এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় জেলে দুলাল মাঝি ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করেন। সেখান থেকে তাঁকে ভোলার চরফ্যাশনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

গলাচিপার জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী জানান, সোমবার এমাদুল, নাজমুল, শাকিল, বায়জীদ ও রাকিবকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার আল আমিন উদ্ধার হন। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন হারুন, আকাশ, ফোরকান, সায়েম ও এবাদুল। ফোরকান ও এবাদুলের মরদেহ সাগরে ভেসে যেতে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন আল আমিন।

গলাচিপার ইউএনও আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, উদ্ধার হওয়া ও নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। স্থানীয় জেলেদের কাছেও নিখোঁজদের সন্ধানে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।