জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা সম্প্রতি টোকিওতে বিদেশি সাংবাদিকদের ক্লাব এফসিসিজেতে দেওয়া এক ভাষণে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও জাপানের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পথনির্দেশনা নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা কিশিদা বর্তমানে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশেষ দূত হিসেবে তিনি ফিলিপাইন সফর করেছেন, যা পদত্যাগের পরও তাঁর সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।

তার ভাষ্যমতে, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের অবসান ঘটছে। ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের উদাহরণ, যা জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতির লঙ্ঘন। এই লড়াই চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে এবং বিশ্ব তার প্রভাব ভোগ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থান কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে, যার মূল কারণ তিনি মনে করেন অসাম্য ও বিভাজন।

কিশিদা তাঁর বক্তব্যে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির প্রত্যাবর্তনকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে বলেছেন। তাঁর মতে, এটি শুধু একজন নেতার ব্যক্তিত্ব দ্বারা প্রভাবিত অস্থায়ী ঘটনা নয়, বরং আরও গভীর ও কাঠামোগত প্রবণতা, যা যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগামী বছরগুলোয় মোকাবিলা করতে হবে। তিনি চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ও অন্তর্মুখী প্রবণতাকেও উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেগুলো বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গভীরে বিদ্যমান হতাশা ও উদ্বেগের প্রতিফলন।

পরিবর্তনশীল বিশ্বের জনবিন্যাস নিয়েও কথা বলেছেন কিশিদা। তার মতে, আগামী ৫০ বছরে জাপানসহ অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশ বয়স্ক জনগোষ্ঠী ও ক্রমহ্রাসমান জন্মহারের মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবে। এই প্রেক্ষাপটে জাপানের সামনে একটিই পথ খোলা আছে বলে মনে করেন তিনি—আইনের শাসনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। অর্থাৎ বহুপক্ষীয়তা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্যের পক্ষে থাকা এবং এসব মূল্যবোধের ভিত্তিতে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

জাপানের কূটনীতি কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে কিশিদা দুটি স্তরের কথা বলেছেন। প্রথমত, আদর্শের অনুসরণ; দ্বিতীয়ত, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে বাস্তবতার মোকাবিলা। তাঁর মতে, জাপানের কূটনীতির ভবিষ্যৎ এই দুইয়ের সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত। তিনি বলেন, 'পারমাণবিক অস্ত্রহীন বিশ্ব কোনো কল্পনা নয়, এটি একটি আদর্শ, যা ধাপে ধাপে বাস্তবসম্মতভাবে অনুসরণ করতে হয়।'

জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা চাপের মুখে থাকায় এমন ধারণা প্রয়োজন, যা মানুষকে একত্র করে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনে। এর কেন্দ্রে থাকতে হবে মানবিক মর্যাদা। জাপান দীর্ঘদিন ধরে মানব নিরাপত্তার ধারণাকে সমর্থন করে আসছে এবং জাতিসংঘ সনদের নীতি ও মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখাই তার অঙ্গীকার। একটি মুক্ত ও অবাধ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের যে দৃষ্টিভঙ্গি জাপান ধারণ করে, তার মূলেও এমন চিন্তাধারা আছে। কিশিদা বলেন, 'আমাদের অবশ্যই সেই নীতিগুলো সমুন্নত রাখতে হবে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করেছে। জাপানকে দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে সেই পরাশক্তির বিরুদ্ধে, যারা বলপূর্বক স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করতে চায়।'