আইবেরীয় উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত জিব্রাল্টার ও স্পেনের মধ্যকার স্থল সীমান্তের বেড়া অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। রাতের বেলায় যন্ত্রপাতি দিয়ে বেড়া ভাঙার কাজ চলছে, এবং আগামী ১৫ জুলাই থেকে এই সীমান্ত সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে ১৯০৮ সালে নির্মিত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তির আওতায় জিব্রাল্টারকে ইইউ কাস্টমস ইউনিয়ন ও শেঙ্গেন অঞ্চলের সাথে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। ফলে জিব্রাল্টার ও স্পেনের মধ্যে মানুষের এবং পণ্যের চলাচলে আর কোনো বাধা থাকবে না। প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার স্প্যানিশ নাগরিক জিব্রাল্টারে কাজ করতে যান এবং সীমান্ত পারাপারে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা এখন আর থাকবে না।
লা লিনেয়া দে লা কনসেপসিওনের বাসিন্দা শিল্পী চোটরানি প্রতিদিন সাইকেলে করে সীমান্ত পার হন। তিনি বলেন, একটি বেড়া মানুষকে আলাদা করতে পারে না; সীমান্ত থাকা অযৌক্তিক। মানবসম্পদ বিভাগের এই কর্মীর মতে, এতদিন পর এই উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি স্বস্তি বোধ করছেন এবং এটি খুবই ইতিবাচক পদক্ষেপ।
জিব্রাল্টারের মাথাপিছু আয় বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, লা লিনেয়া ও আশপাশের এলাকা স্পেনের সবচেয়ে বঞ্চিত অঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে বেকারত্বের হার প্রায় ৩০ শতাংশ। সীমান্ত খোলার ফলে এই বৈষম্য কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। লা লিনেয়ার মেয়র জুয়ান ফ্রাঙ্কোর মতে, শহরের গড় ব্যবসার এক-তৃতীয়াংশ আয় জিব্রাল্টারের গ্রাহকদের কাছ থেকে আসে। তিনি এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেন, ব্রেক্সিটের পর এক দশকের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে এবং এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জিব্রাল্টারের মুখ্যমন্ত্রী ফাবিয়ান পিকার্ডো সরকারি সদর দপ্তরে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, গত আট প্রজন্মের জিব্রাল্টারবাসীর জন্য সীমান্ত বেড়াই ছিল প্রধান প্রতিবন্ধকতা। এখন থেকে জিব্রাল্টার ও স্পেনের মধ্যে মানুষের ও পণ্যের সম্পূর্ণ স্বচ্ছন্দ চলাচল নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি গ্রাহক পাবে, কারণ সীমান্তে দীর্ঘ সারির ভীতি থাকবে না। পিকার্ডো এই চুক্তিকে স্পেনের ১৯৬৯ সালের অবরোধের বিপরীত এবং এক নতুন ভোর হিসেবে বর্ণনা করেন।
চুক্তির শর্তানুযায়ী, জিব্রাল্টারে বিক্রিত পণ্যকে এখন থেকে ইইউ বিধি মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি, জিব্রাল্টারে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) না থাকায় নতুন একটি লেনদেন কর চালু করা হচ্ছে। এই করের হার চলতি বছরে ১৫ শতাংশ থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীতে ১৭ শতাংশে উন্নীত হবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে আবগারি শুল্কও বাড়ানো হবে।
অ্যাংলো হিসপানো কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জন আইসোলা এই সমঝোতাকে ভালো বললেও নতুন নিয়ম ও কর কাঠামো নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, ইইউর বাইরে থেকে পণ্য আনার ক্ষেত্রে কাগজপত্রের জটিলতা বাড়বে এবং প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, পর্যটক ও গ্রাহকের সংখ্যা বাড়লে ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস এই চুক্তিকে জিব্রাল্টারের জন্য 'নতুন যুগ' হিসেবে অভিহিত করেন। সবমিলিয়ে, ১৫ জুলাই থেকে সীমান্ত উন্মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে জিব্রাল্টার ও স্পেনের মধ্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, যা মানবিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যে বিরাট পরিবর্তন আনবে বলে ধরা হচ্ছে।




