যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসরত অণু নামের এক বাংলাদেশি অভিবাসীর জীবনযাত্রা সাধারণ নয়। তিনি ডিভি ভিসায় দেশটিতে এসেছিলেন হাতে মাত্র দুটি স্যুটকেস আর অসংখ্য অনিশ্চয়তা নিয়ে। প্রথম দিকে ডেলিভারি কাজ, গ্যাসস্টেশনে রাতের ডিউটি, ট্যাক্সি চালানো—এসবের মধ্যদিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তবে তিনি বুঝেছিলেন, দেশের ডিগ্রি যত বড়ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা ছাড়া কিছুই হবে না। তাই কাজের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি একটি করপোরেট অফিসে সম্মানজনক পদে কর্মরত।
অণুর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন স্নেহময় পিতা। তার মেয়ে রিয়া এখন কৈশোর পার করছে। অণু মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস করিয়েছেন, লাইব্রেরিতে হাত ধরে নিয়ে গেছেন। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে একটি মেয়েকে মানুষ করাকে তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। তিনি চেয়েছেন, মেয়ে নিজের মতো করে বেড়ে উঠুক, বাইরের কোনো চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার বা নিয়ম নয়। খুব সচেতনভাবেই তিনি মেয়েকে খোলামেলা মেলামেশার সীমারেখা বোঝাতে চেয়েছেন।
এক শুক্রবার রাতে ঘটে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। মেয়ে জানায়, ম্যানহাটানে বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে যেতে চায়। অণু অনুমতি দেন, তবে শর্ত দেন—সাবওয়েতে ফেরার সময় টেক্সট করতে হবে, আর রাত বেশি হলে তিনি গিয়ে নিয়ে আসবেন। মেয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়েও বেরিয়ে যায়। রাত বাড়তে থাকে। দশটা, এগারোটা, বারোটা—অণু একবার মেসেজ পাঠান, সব ঠিক আছে জানিয়ে মেয়ে উত্তর দেয়। কিন্তু রাত প্রায় দুইটায় মেয়ে জানায়, সে সাবওয়েতে উঠেছে এবং ৪৫ মিনিটের মধ্যে ১৬৯ স্ট্রিট স্টেশনে পৌঁছাবে। অণু আর বসে থাকতে পারেননি। জ্যাকেট পরে স্টেশনে গিয়ে দাঁড়ান।
ঠান্ডা বাতাসে কাঁপা স্টেশনের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অণু বারবার ঘড়ি দেখেন। অবশেষে ট্রেন থেকে নামা মেয়েকে দেখতে পান। কিন্তু তার হাঁটার গতি এলোমেলো, চোখ ভারী, মুখে অনিচ্ছাকৃত হাসি। কাছে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন—মেয়ে মদ্যপ। অণু কিছু না বলে শুধু তার হাত ধরে নেন, যেন সে পড়ে না যায়। বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির ভেতর চাপা নীরবতা। অণুর মনে প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—কোথায় ভুল হলো? কি বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে?
বাড়িতে পৌঁছে মেয়ে বাথরুমে ছুটে যায় এবং বারবার বমি করে। অণুর স্ত্রী মেখলা ঘুম থেকে উঠে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ফুঁসে ওঠেন। তিনি মনে করেন, এত স্বাধীনতা দেওয়ার ফল এই। কিন্তু অণু শান্তভাবে বলেন, এখন ঝগড়ার সময় নয়, আগে মেয়েকে দেখতে হবে। তিনি মেয়েকে ঘরে এনে শুইয়ে দেন এবং সকালে কথা বলার কথা বলেন। সেই রাতে অণুর ঘুম আসেনি। তিনি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিউইয়র্কের জাগ্রত রাত দেখেন এবং স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে পার্থক্য নিয়ে ভাবতে থাকেন।
সকালে মেয়ে উঠে বসে। মাথা ব্যথা, চোখ ফুলে আছে। সে বাবার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, আমি কি খুব খারাপ হয়ে গেছি?’ এই প্রশ্নে অণু থমকে যান। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন, মানুষ ভুল করে, কিন্তু তখনই মানুষ হয় যখন সে বুঝতে পারে ভুল ছিল। তিনি মেয়েকে আরও বলেন, ‘আমি বিচারক না, আমি তোর বাবা। ভুল করলে লুকাবি না, আমার কাছে আসবি।’ মেয়ে কাঁদতে থাকে। অণু তাকে জানান, তিনি রাগ করেননি, কারণ রাগ করলে মেয়েকে হারিয়ে ফেলবেন।
মেখলাও পরে এসে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন এবং নিজের রাগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। সেদিন দুপুরে অণু মেয়েকে হাঁটতে নিয়ে যান। তারপর বাড়িতে এসে তারা একসঙ্গে প্রিয় সিনেমা ‘অপরাজিতা’ দেখেন। অণু বুঝতে পারেন, শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়—ভালোবাসাকে সাহসী হতে হয়, সাপোর্টিভ হতে হয়, আর কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়। এই ঘটনা অণু ও তার মেয়ে উভয়ের জন্যই নতুন করে শেখার ও বেড়ে ওঠার সুযোগ এনে দেয়।




