ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় অনেক দর্শকের চোখেই পড়ে একটি সাধারণ দৃশ্য—খেলোয়াড় বোতল থেকে এক চুমুক পানি বা স্পোর্টস ড্রিংক মুখে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড কুলি করেন, তারপর গিলে না ফেলে মাঠেই ফেলে দেন। প্রথম দর্শনে এটি পানি অপচয় মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে ক্রীড়াবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যা ‘কার্বোহাইড্রেট মাউথ রিন্স’ নামে পরিচিত।

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় এমন ক্রীড়াবিদদের মধ্যে এই পদ্ধতি বহুল প্রচলিত। শুধু ফুটবলাররাই নন, সাইক্লিস্ট, ম্যারাথন দৌড়বিদ এবং অন্যান্য ধৈর্যশক্তির খেলার প্রতিযোগীরাও এটি ব্যবহার করেন। কয়েক সেকেন্ড মুখে কার্বোহাইড্রেটযুক্ত পানীয় রেখে কুলি করে ফেলে দিলে মুখের ভেতরের নির্দিষ্ট রিসেপ্টরগুলো সক্রিয় হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব রিসেপ্টর কার্বোহাইড্রেটের উপস্থিতি শনাক্ত করে মস্তিষ্কের পুরস্কার, উদ্দীপনা ও মোটর নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অংশে সংকেত পাঠায়। ফলে শরীর প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত শক্তি না পেলেও মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য শক্তি সরবরাহের বিভ্রম পায়, যা খেলোয়াড়ের সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়িয়ে কর্মক্ষমতায় অস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে পানীয়টি গিলে ফেলা হয় না কেন? ম্যাচ চলাকালীন বিরতি খুবই সীমিত হয়। স্পোর্টস ড্রিংক গিলে ফেললে পেট ভারী লাগতে পারে বা দ্রুত দৌড়ানোর সময় অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এছাড়া পানীয় গিলে সেটি হজম ও শোষিত হতে সময় লাগে, কিন্তু মুখে কুলি করলেই মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় সংকেত তৎক্ষণাৎ পৌঁছে যায়। এ কারণেই অধিকাংশ খেলোয়াড় এই দ্রুত কৌশলকে অগ্রাধিকার দেন।

২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ‘কার্বোহাইড্রেট মাউথ রিন্স’ ব্যাপক আলোচনায় আসে, যদিও এটি আগে থেকেই ব্যবহৃত হতো। ক্যামেরায় ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন, পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ খেলোয়াড়কে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে দেখা যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, এই কৌশল কখনোই শরীরের পানি বা ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। খেলোয়াড়দের নিয়মিত পানি এবং ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে ঘামের ক্ষয়পূরণ করতে হয়, যা ম্যাচ শুরুর আগে, বিরতির সময়, ম্যাচ শেষে এবং নির্ধারিত হাইড্রেশন ব্রেক বা কুলিং ব্রেক-এ হয়ে থাকে।

গবেষকেরা জানান, ‘কার্বোহাইড্রেট মাউথ রিন্স’ মূলত দীর্ঘ ও উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলার জন্য উপযোগী। সাধারণ হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা দৈনন্দিন কাজের ক্ষেত্রে এর কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। তাই মাঠে ফুটবলারদের মুখে পানি নিয়ে কুলি করে ফেলে দিতে দেখলে বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই; এটি পানি অপচয় নয় বরং পারফরম্যান্স বৃদ্ধির জন্য ক্রীড়াবিজ্ঞানে স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। তবে পর্যাপ্ত পানি পান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যা নিশ্চিত করে শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় থাকে।