ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম রঘুনাথপুর পাহাড়িয়াপাড়ায় মাটি ও বাঁশের তৈরি এক অনন্য স্কুল ‘পাহাড়িয়াপাড়া আগামীর স্কুল’ গ্রামীণ শিক্ষার চিত্র বদলে দিচ্ছে। স্কুলটির প্রধান ফটক, দেওয়াল, ছাউনি, দরজা, জানালা এমনকি আসবাবপত্রও মাটি, বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি। দৃষ্টিনন্দন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের প্রচেষ্টা ও গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এর আগে গ্রামটিতে শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রাম থেকে নিকটতম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির দূরত্ব ছিল দুই কিলোমিটার। বর্ষায় কাদাপথ পেরিয়ে শিশুদের ওই দূরত্ব অতিক্রম করা ছিল দুরূহ। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হতেন না। এতে গ্রামে সাক্ষরতার হার ছিল নিম্নমুখী। বিশেষ করে ছোট শিশু ও মেয়েরা স্কুলে দেরিতে ভর্তি হতো বা একেবারেই লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত থাকত।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য স্থানীয় তরুণেরা এগিয়ে আসেন। তারা গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘরের আদলে একটি স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। স্থানীয় এক যুবক স্কুলের জন্য ২৬ শতক জমি দান করেন। গ্রামবাসীরাও নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বাঁশ, মাটি ও শ্রম দিয়ে সহায়তা করেন। বেসরকারি সংস্থাটি শ্রমিক খরচ বহন করে। ২০২৪ সালে নির্মাণকাজ শেষে ২০২৫ সাল থেকে স্কুলটিতে পাঠদান শুরু হয়।
বর্তমানে স্কুলটিতে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলছে। মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫৮। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন হিসেবে প্রাক-প্রাথমিকে ১০০ টাকা, প্রথম শ্রেণিতে ১২০ টাকা ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৪০ টাকা নেওয়া হয়। এই বেতন ও সংস্থার সহায়তায় স্কুলটি পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, এখন কাছেই স্কুল হওয়ায় তারা নিয়মিত আসছে এবং পড়ালেখায় আগ্রহী। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম আক্তার জানায়, আগে স্কুল দূরে থাকায় পড়তে পারত না, এখন এই স্কুলে এসে খুব ভালো লাগছে এবং সে ডাক্তার হতে চায়। আরিফুল ইসলামও জানায়, আগে দূরত্বের কারণে তার মা-বাবা তাকে স্কুলে পাঠাতেন না, এখন সে নিয়মিত স্কুলে যায়।
স্কুলের সমন্বয়ক সেলিম আহমেদ বলেন, এলাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও শিক্ষার প্রসারে মাটির তৈরি এই স্কুল একটি মাইলফলক। স্থানীয় সম্পদ ও জনশক্তি ব্যবহার করে স্কুলটি পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রো-ইয়োর রিডার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাদিয়া জাফরিন বলেন, মাটির স্কুল দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত বাধা দূর করেছে। এটি পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল। প্রচলিত ভবনের তুলনায় নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ কম, প্রায় দুই হাজার টন কার্বন নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে এবং শ্রেণিকক্ষের তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এলাকায় দীর্ঘদিন বিদ্যালয় না থাকায় শিশুরা নিরক্ষর থেকে যাচ্ছিল। বর্তমান উদ্যোগ প্রশংসনীয়, তবে এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনেরও প্রয়োজন রয়েছে।
শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা সুমন মিয়া জানান, তিনি নিজে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং নিজেদের জমি দিয়ে ও শিক্ষক হিসেবে যুক্ত থেকে গ্রামের শিক্ষার ফাঁক পূরণে কাজ করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আমীর হামজা ও সিরাজুল ইসলাম গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।


