কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ সম্প্রতি প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। গত সোমবার সংঘর্ষে আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের দুই বাসিন্দা মাসুদ ও হিরণ নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। এই ঘটনায় ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে কয়েক ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল এবং আতঙ্কে অনেকেই ঘর ছেড়েছেন।

বিরোধের সূত্রপাত ২০২৩ সালের জুলাইয়ে, যখন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করে। সবুজ পটভূমিতে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল— ‘আকবরনগর বাজার। উল্টো পথে আর নয়, নিয়মনীতির হবে জয়।’ এই সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা থাকায় মিরারচর গ্রামের বাসিন্দারা তীব্র আপত্তি জানান। তারা ২০২৩ সালের ৯ জুলাই সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন, যা দফায় দফায় সংঘর্ষের সূত্রপাত করে। সেই সময় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন এবং বহু দোকানপাট ভাঙচুর হয়েছিল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাজারটি ১৯৯১ সালে আকবরনগর ও মিরারচর—দুই গ্রামের মানুষের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে এটি ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। বাজারের পরিচালনায় একটি অলিখিত চুক্তি অনুযায়ী সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ হন আকবরনগরের প্রতিনিধি, আর সাধারণ সম্পাদক হন মিরারচরের প্রতিনিধি। বর্তমানে এখানে ২০০টির বেশি দোকান আছে, তবে সরকারি কোনো নাম বা ইজারা নেই। জমির মালিক ৬৬ জন ব্যক্তি, আর ব্যবসা চলে ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে।

গত ১৯ জুলাই বাজার এলাকায় একটি রিকশার ধাক্কাকে কেন্দ্র করে আবার উত্তেজনা শুরু হয়। মিরারচরের দ্বীন ইসলাম অভিযোগ করেন, আকবরনগরের রিকশাচালক শরিফ মিয়া তাঁকে ধাক্কা দেন। শরিফের দাবি, তিনি শুধু রাস্তা থেকে সরাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু গ্রামের পরিচয়ের কারণে তাঁকে মারধর করা হয়। এই ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মিরারচরের মানুষ আবার সাইনবোর্ড পরিবর্তনের দাবি তোলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়।

আকবরনগরবাসীর যুক্তি, বাজারের তিন দিকই তাদের গ্রামের মধ্যে অবস্থিত। বাসস্ট্যান্ড সরকারি নথিতে ‘আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড’ নামে পরিচিত এবং বাজার আকবরনগর মৌজায় অবস্থিত। তাই সাইনবোর্ডে অন্য গ্রামের নাম যুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই বলে তাদের দাবি। অন্যদিকে মিরারচরবাসীর বক্তব্য, বাজারটি যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে এবং তিন দশক ধরে যৌথভাবেই পরিচালিত। তাই হঠাৎ করে শুধু একটি গ্রামের নাম উল্লেখ করা ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মিরারচরের বাসিন্দা ও বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক বরজু মিয়া বলেন, বাজার প্রতিষ্ঠায় দুই গ্রামের মানুষের সমান ভূমিকা থাকায় সাইনবোর্ডে দুই গ্রামের নামই থাকা উচিত।

ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশিদ জানান, বিরোধের স্থায়ী সমাধানে প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ সংঘর্ষের আগের দিনও দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল, কিন্তু অঙ্গীকার রক্ষা হয়নি। সওজ কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, সরকারি গেজেটে কোনো নাম নির্ধারিত না থাকায় প্রচলিত নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সাইনবোর্ট যদি জনশান্তি বিঘ্নিত করে ও প্রাণহানির কারণ হয়, তাহলে তা সংশোধন বা অপসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এই ঘটনা শুধু একটি নামের বিরোধ নয়, বরং দুই গ্রামের সামাজিক সম্পর্ক, আত্মীয়তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় গভীর চিড় ধরিয়েছে। বাজারে এখন অনেক ক্রেতা দোকানির গ্রাম পরিচয় দেখে কেনাকাটা করেন। ব্যবসায়ীরা জানান, বিরোধের পর আকবরনগর ও মিরারচরের ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কমে গেছে এবং আশপাশের গ্রামের লোকজন বেশি ব্যবসা করছেন। স্থানীয় চায়ের দোকানি জাকির মিয়া বলেন, একটি সাইনবোর্ড এত দিনের সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। এখন প্রশাসন ও সওজের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে দুই গ্রামের মানুষ।