দেশের টেলিভিশন মাধ্যমের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সাবেক মহাপরিচালক ও প্রখ্যাত নির্মাতা মোস্তাফিজুর রহমান পরলোকগমন করেছেন। গত রোববার সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) যে সময়টিকে স্বর্ণালি অধ্যায় বলা হয়, সেই সময়ের একজন অগ্রগণ্য নির্মাতা ও প্রযোজক ছিলেন তিনি। তাঁর প্রযোজনায় বাংলা নাটকের জগতে একাধিক কালোত্তীর্ণ কাজ নির্মিত হয়। টেলিভিশনে দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পাশাপাশি তিনি বিটিভির মহাপরিচালকের গুরুদায়িত্বও পালন করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

প্রখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যকার মামুনুর রশীদ এক আবেগঘন স্মৃতিচারণায় বলেন, জীবন হয়তো এমনই। যার সঙ্গে দিন-রাত কাটত, গভীর রাত অবধি চলত আড্ডা, লেখালেখি আর খাওয়াদাওয়ার মাঝেই সৃজনের কাজ হয়ে যেত—সেই মুস্তাফিজ ভাই এখন আর নেই। তিনি ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। চিত্রনাট্য, সংলাপ থেকে শুরু করে অভিনয় পর্যন্ত কোনো কিছুই তার পছন্দ না হলে তিনি পুরো কাজ পুনরায় শুরু করতেন, শুটিং শেষের পরও ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

মামুনুর রশীদ জানান, মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলনের মতো লেখকদের যাতায়াত ও আড্ডার ফলস্বরূপ ‘সময়-অসময়’ ধারাবাহিক, ‘একটি সেতুর গল্প’, ‘স্বপ্নের শহর’, এবং হুমায়ূনের ‘এইসব দিনরাত্রি’র মতো কিংবদন্তি কাজগুলো তৈরি হয়। এমনকি ‘শঙ্খনীল কারাগার’ চলচ্চিত্রটিও এর বহিঃপ্রকাশ।

সেই সময় একটিই মাত্র টেলিভিশন কেন্দ্র থাকায় প্রযোজকদের মাঝে সৃজনশীলতার তীব্র প্রতিযোগিতা চলত। এই পরিবেশে নতুন লেখক ও অভিনেতাদের জন্ম হচ্ছিল, আর সেই স্বর্ণযুগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। দীর্ঘদেহী ও ধীরস্থির স্বভাবের এই মানুষটি সততার প্রতীক হিসেবে পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় মাধ্যমেই বড় দায়িত্ব সামলেছেন। তার সহধর্মিণী রওশন আরা মুস্তাফিজ একজন খ্যাতিমান গায়িকা এবং দুই পুত্রও শিল্প অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত।

নানা অসুস্থতা ও প্রবাস যাপনের কারণে শেষের দিকে যোগাযোগ কমে এলেও কৃতজ্ঞতা ও স্মৃতি অফুরান বলে উল্লেখ করেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, নিজের স্ত্রী ও চার দিন আগে মায়ের মৃত্যু তাকে প্রবল নিঃসঙ্গতায় ফেলেছে, এই পরিস্থিতিতে এক নিভৃতচারী স্রষ্টার চলে যাওয়া সেই নিঃসঙ্গতাকে আরও বাড়িয়ে দিল। তবে বাংলার টেলিভিশনের সৃজনশীলতার ইতিহাসে মোস্তাফিজুর রহমান চিরকাল একটি উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকবেন।