কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিল্পের দ্রুত প্রসারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন নতুন এক ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। এআই নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রশাসনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চললেও বর্তমানে তা অনেক বেশি বাস্তব ও ভৌত রূপ নিয়েছে। কারণ ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য যখন প্রচুর জমি, বিদ্যুৎ, পানি এবং ফাইবার নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হচ্ছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে থাকা জমি শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার বা গবেষণার স্থান হিসেবে নয়, বরং এআই অবকাঠামো হিসেবেই বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে।

এই ধারার একটি উদাহরণ হলো জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির (GWU) ভার্জিনিয়ার ক্যাম্পাস বিক্রি করে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্প্রতি ৪২ কোটি ৭০ লাখ ডলারে অ্যাশবার্নের প্রায় ১২০ একর জমিতে অবস্থিত সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ক্যাম্পাসটি অ্যামাজন ডেটা সার্ভিসেসের কাছে হস্তান্তর করেছে। ক্রেতার নাম এবং দাম গোপন রাখার কারণে শুরুতে এই বিক্রয় নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও পরে ছাত্র সংবাদপত্রের তদন্তে বিষয়টি প্রকাশ পায়। বিক্রির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশলের অংশ। চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টি পাঁচ বছর পর্যন্ত জায়গাটি ব্যবহার করতে পারবে এবং এই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন এনডোমেন্ট তহবিলে রাখা হবে। এছাড়া যোগ্য শিক্ষক ও কর্মচারীরা এককালীন বোনাস পাবেন।

তবে সাবেক অধ্যাপক এলেন স্কালি-রাস এই বিক্রয়কে উচ্চশিক্ষার একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বড় জমির মালিক, আর ডেটা সেন্টারের জন্য এখন এক ধরনের ভূমিদস্যুতা চলছে। তার মতে, অ্যাশবার্ন ক্যাম্পাসটি দীর্ঘদিন ধরে GWU-র কৌশলে নিজের জায়গা করে নিতে পারেনি এবং সম্পদের ক্রমাগত ক্ষয়ের শিকার হয়েছিল। ক্যাম্পাসটি বিক্রির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষায়, এখানে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। এই বিক্রয় সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে বিক্রয় ঘোষণার পর শিক্ষক, কর্মচারী এবং প্রোগ্রামগুলোর পরিবর্তন নিয়ে তারা আলোচনার সভা করেছে। আর্থিক দিক থেকে চাপের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া বোধগম্য, কিন্তু স্কালি-রাসের মতে, এআই অবকাঠামোর প্রসারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জমি ব্যবহারের বিষয়ে গভীর প্রশ্ন উঠছে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার সম্পদকে আমরা এমন একটি প্রযুক্তির জন্য বিলিয়ে দিচ্ছি, যার জবাবদিহিতা বা চিন্তাশীল অগ্রগতি নেই।

অপরদিকে, মিশিগান ইউনিভার্সিটি একটি ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা ইপসিলান্টি টাউনশিপে ১২৫ কোটি ডলারের একটি গবেষণা কম্পিউটিং সেন্টার নির্মাণ করছে, যা লস অ্যালামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত হবে। এই কেন্দ্রটি চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, পরিচ্ছন্ন শক্তি, প্রকৌশল এবং জাতীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশাল কম্পিউটেশনাল কাজে সহায়তা করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য একে বাণিজ্যিক ডেটা সেন্টার বলতে আপত্তি জানিয়ে 'কম্পিউটিং সেন্টার' নামে অভিহিত করছে। তাদের দাবি, এই কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহার হবে না, বরং এটি হবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য নিবেদিত একটি বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করছে। ইপসিলান্টি টাউনশিপ বোর্ড অফ ট্রাস্টিজ সর্বসম্মতভাবে এই প্রস্তাবিত গবেষণা সুবিধার বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। এর আগে ২০২৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি এই প্রকল্পের জন্য ১৯.৮২ একর এবং ৬.০৩ একর জমি কেনার অনুমোদন পায় এবং ২০২৫ সালে আরও প্রায় ১২৪.৭ একর জমি কেনার অনুমোদন লাভ করে। গবেষণা কেন্দ্রটি চালু করতে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, যা পরে ১০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।