ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে এবারের ফাইনাল যেন এক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। দীর্ঘ ৬০ বছর পর কোনো প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। ফিফা র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ চার দলই সেমিফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে এই দুই পরাশক্তি। উয়েফা ইউরো ও কনমেবল কোপা আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে সরাসরি বিশ্বকাপের ফাইনালে লড়াইটি বাতিল হয়ে যাওয়া ফিনালিসিমার অভাব পূরণ করছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই ম্যাচকে ঘিরে আবেগের যেন কমতি নেই। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির স্ত্রী স্প্যানিশ, তাঁর সন্তানেরা জন্মেছেন স্পেনে। স্পেনের ক্লাব মায়োরকাতেও খেলেছেন তিনি। অন্যদিকে, স্পেনের কোচ দে লা ফুয়েন্তে স্কালোনির শিক্ষক। ফলে কৌশলগত ও মানসিক লড়াইয়ে স্কালোনির জন্য পরিস্থিতি বেশ জটিল। বার্সেলোনা সমর্থকদের জন্যও দোটানা আছে। লিওনেল মেসিকে ভালোবেসে যারা এই ক্লাবের অনুরাগী হয়েছেন, তাদের অনেকেরই স্পেনের জার্সিতে বার্সার আটজন খেলোয়াড়কে দেখতে হচ্ছে। পেদ্রি, গাভি, লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমোরা প্রতিটি ম্যাচেই মাঠে নামছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের শিরোপার লড়াইয়ে কেউ কাউকে ছাড় দেবে না।

দুই দলের শক্তি-দুর্বলতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের হার না মানা মানসিকতা, মেসির ম্যাজিক ও স্কালোনির কৌশল। গ্রুপ পর্ব ভালোভাবে পার করলেও কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তাদের ভরসা ছিল মেসি ও কোচের দক্ষতা। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ঘুমপাড়ানি ফুটবলেও স্কালোনির আক্রমণাত্মক কৌশল কাজে লেগেছে। সেট পিস ও দূরপাল্লার শটে আর্জেন্টিনা এগিয়ে। বিশ্বকাপে তারা ডি-বক্সের বাইরে থেকে পাঁচটি গোল করেছে। অন্যদিকে, স্পেনের শক্তি তাদের সাবলীল ও গতিময় আক্রমণ। উনাই সিমোনের গোলরক্ষকতা, পাউ কুবারসি-লাপোর্তের জমাট রক্ষণ, পেদ্রি-রদ্রি-রুইজের মধ্যমাঠ নিয়ন্ত্রণ এবং লামিনে ইয়ামালের ভয়ংকর উপস্থিতি। তবে সিমোনের দূরপাল্লার শট ও কুইক হেড আটকানোর দুর্বলতা আছে। স্পেনের উইংব্যাক পোরো ও কুকুরেয়া মিলে ১৩টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, যেখানে আর্জেন্টিনার ফুলব্যাক মোলিনা ও তালিয়াফিকো দুর্বল। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের গোলটি মোলিনার ভুলেই এসেছিল।

পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপে এই দুই দল মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছে, ১৯৬৬ সালে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জিতেছিল। তবে প্রীতি ম্যাচে স্পেন তিনবার জিতেছে, সর্বশেষ ২০১৮ সালে ৬-১ গোলের বড় জয়। তবে ফাইনালে অতীত পরিসংখ্যান অর্থহীন হয়ে যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। মাঠের কৌশল, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও স্নায়ুর লড়াইই চূড়ান্ত করবে বিজয়ী।

এদিকে, ফিফা উত্তর আমেরিকার ক্রীড়া সংস্কৃতির অনুসরণে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নশিপ রিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিজয়ী দলের প্রতিটি খেলোয়াড় ও কোচকে কাস্টমাইজড রিং দেওয়া হবে। মোট ২,০২৬টি রিং তৈরি করা হচ্ছে, যার মধ্যে মাত্র ৩০টি বিশ্বজয়ী দল পাবে। তবে ট্রফি বা রিং যার শোকেসেই যাক, এই ফাইনাল যে ফুটবলের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে তা নিশ্চিত।