একসময় নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। নিয়মিত নাটক, গান, নৃত্য ও সাহিত্য আয়োজনে মুখর থাকত জেলাটি। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা এসব আয়োজনে অংশ নিতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিয়মিত অনুষ্ঠানের জন্য উপযোগী আধুনিক কোনো মিলনায়তনের অভাব। জেলা শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব কোনো মিলনায়তন নেই। তাই সংগঠনগুলোকে নির্ভর করতে হয় শহরের পুরোনো জেলা পাবলিক হলের ওপর। ১৯৬০ সালে নির্মিত জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন এই আধা পাকা ভবনটির ধারণক্ষমতা চার শতাধিক হলেও এতে পর্যাপ্ত চেয়ার, ফ্যান ও আলোর ব্যবস্থা নেই। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও অনুপস্থিত। পুরুষ ও নারী শিল্পীদের জন্য আলাদা প্রসাধনকক্ষেরও সুবিধা নেই। একটি ছোট মঞ্চেই সব অনুষ্ঠান করতে হয়। প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দিতে হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, যা সীমিত সামর্থ্যের সংগঠনগুলোর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক ও কবি তানভীর জাহান চৌধুরী বলেন, লোকসংস্কৃতির তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। জরাজীর্ণ পাবলিক হলের ভাড়া বেশি হওয়ায় সংগঠনগুলো সেখানে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারে না, ফলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শহরের সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাংস্কৃতিক চর্চায় নেত্রকোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জন্মদিন উদ্যাপন হয় এই জেলায়। ১৯৬৯ সালে ঢাকার বাইরে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রথম শাখাও গড়ে ওঠে নেত্রকোনায়। বর্তমানে জেলায় নাটক, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তির চর্চা এবং প্রশিক্ষণ দেয় এমন সক্রিয় সংগঠনের সংখ্যা ২০টির বেশি। যাত্রা ও নাট্যচর্চায়ও নেত্রকোনার স্বতন্ত্র পরিচিতি আছে। শহরের রেলক্রসিং এলাকায় প্রিন্সেস বিউটি সাজঘর, আনোয়ারা সাজঘরসহ কয়েকটি অপেরা এখনো যাত্রাচর্চা করছে। নাট্যচর্চা করছে উদীচী, প্রত্যাশা, কচিকাঁচা থিয়েটার, সৎসঙ্গ থিয়েটার, রংধনু ও নবনাট্য পরিষদ। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, হায়দার-শেলী স্মৃতি সংগীত বিদ্যালয়, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, ঝংকার, অগ্রান, তৃণযোগ, নেত্রকোনা বাউল সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও সাহিত্যচর্চা করছে। তরুণ শিল্পীদের কয়েকটি ব্যান্ডও আছে। কিন্তু উপযুক্ত মিলনায়তনের অভাবে এসব সংগঠনের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গত ১৪ বছর ধরে মিলনায়তনের অভাবে ভুগছে জেলাটি। শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির পাশে একসময় ছিল ‘মহুয়া অডিটোরিয়াম’। ১৯৭৯ সালে পৌরসভার জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এটি নির্মাণ করে। পরে জায়গাটির মালিকানা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমি ও পৌরসভার মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং এ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে প্রায় ১৫ বছর আগে সেটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ছয় বছর আগে ভবনটি ভেঙে ফেলে পৌরসভা। এরপর সেখানে আর নতুন কোনো মিলনায়তন নির্মাণ করা হয়নি। আধুনিক মিলনায়তনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকেরা মানববন্ধন, স্মারকলিপিসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। জনপ্রতিনিধিরাও বিভিন্ন সময়ে আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক জানান, জেলায় একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি আশা করছেন, এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, মোক্তারপাড়ায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি-সংলগ্ন জায়গায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জায়গার বিষয়টি সমাধানের কাজ চলছে এবং এ নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
মিলনায়তনের অভাবে স্তিমিত নেত্রকোনার সাংস্কৃতিক অঙ্গন
নেত্রকোনায় আধুনিক মিলনায়তনের অভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়েছে। জরাজীর্ণ পাবলিক হল ও উচ্চ ভাড়ার কারণে সংগঠনগুলো নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে পারছে না। নতুন মিলনায়তন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো অগ্রগতি নেই।



