আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগ শাসনামলের গুম, খুন ও নির্যাতনের ঘটনায় মোট ৭১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৫০২ জন। এর মধ্যে পলাতক আছেন ৩১৫ জন এবং বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন ১৮৪ জন। একজন আসামি আত্মহত্যা করেছেন এবং একজনকে ক্ষমা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তারের পর থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত সাজা ভোগ করেছেন একজন আসামি। উল্লেখ্য, অনেক আসামি একাধিক মামলায় জড়িত থাকায় তাদের একাধিকবার গণনা করা হয়েছে। যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা বিচারাধীন এবং একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, ফলে তাকে সাতবার গণনা করা হয়েছে। তবে যে ছয় মামলার রায় হয়েছে, সেগুলোতে কোনো আসামিকে একাধিকার গণনা করা হয়নি।
এ পর্যন্ত ছয়টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ে শেখ হাসিনাসহ মোট ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ১১ জন পলাতক এবং বাকি চারজন কারাগারে আছেন। এছাড়া যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে ৪৬ জনকে। প্রথম রায় আসে গত বছরের ১৭ নভেম্বর, যখন জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দ্বিতীয় রায় আসে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি, চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ও আরও দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তৃতীয় রায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি আসে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে, যেখানে আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চতুর্থ রায় গত ৯ এপ্রিল রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। পঞ্চম রায় গত ২৮ জুন রামপুরা মামলায় হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৩০ জুন জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিচারাধীন ২৩টি মামলায় মোট ৩১৬ আসামির বিচার চলছে। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় শেখ হাসিনা আসামি। অন্যান্য আসামিদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদসহ ৩১ জন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যরা রয়েছেন। ২৩টি মামলার মধ্যে নয়টি আওয়ামী লীগ শাসনামলের গুম, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায়। উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা, যাতে শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া র্যাবের টিএফআই সেল ও ডিজিএফআইয়ের জেআইসির মামলায় সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের বিচার চলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪ মামলার বিচার চলছে, যার মধ্যে একটি মামলায় শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও আসামি।
রায়ের অপেক্ষায় একটি মামলা রয়েছে। কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল-২-এ ১০ জুন থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ। এই মামলায় আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। তারা সবাই পলাতক।
তদন্তাধীন ৪১টি মামলার মধ্যে কয়েকটিতে ইতিমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন, সাবেক এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ, ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকত ও সাবেক কমিশনার মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুব শিগগির এসব প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এত অল্প সময়ে এত সংখ্যক স্পর্শকাতর মামলার রায় হওয়া বিরল, এবং তারা এতে সন্তুষ্ট। রাজধানীর চানখাঁরপুল মামলার বাদী শেখ জামাল হাসান বলেন, যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাদের সাজা কার্যকর করার দাবি জানান এবং অন্যদের সাজাও বাড়ানোর কথা বলেন।


