সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিশিষ্ট চিন্তক সলিমুল্লাহ খানের আত্মভাব গ্রন্থমালা সিরিজের দ্বিতীয় বই ‘রতি ও বিরতি’। বইটির উপশিরোনাম ‘সাক্ষাৎকার ২০২৪-২০২৬’ থেকে স্পষ্ট, এর সূচনা ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে। ‘মধুপোক’ থেকে প্রকাশিত এই সংকলনে জুলাই ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে প্রকাশিত অধ্যাপক খানের ১৯টি সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদে রয়েছে চিত্রশিল্পী দেবাশিস চক্রবর্তীর শিল্পকর্ম। সাক্ষাৎকারগুলো ‘রতি’, ‘বিরতি’ ও ‘আরতি’ — এই তিন পর্বে সজ্জিত; শেষভাগে সংযোজিত হয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের আগে দেওয়া তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতাও।

সংকলনটি জুলাই-উত্তর বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুধাবনের এক বলিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক নির্দেশিকা হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা যায়। পুস্তকটি মোটা দাগে তিন ধরনের মূল্য বহন করে। প্রথমত, এতে আছে সমসাময়িক ইতিহাসের ‘ঘটনার প্রত্যক্ষ মূল্যায়ন’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মেয়াদে প্রকট হওয়া আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটগুলোর বিশ্লেষণে এই আলোচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারের কাঠামো কেমন হওয়া উচিত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনরাবৃত্তি, সংবিধান সংস্কার নাকি নতুন সংবিধান রচনা, মব সহিংসতার মতো বিষয়গুলোতে অধ্যাপক খানের সুপষ্ট ব্যাখ্যা এতে হাজির হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বারবার ফিরে আসা কিছু সাধারণ ঐতিহাসিক সংকটকে তিনি এতে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন, যেগুলোর সমাধান সাধারণ পন্থায় না হওয়ায় জনগণকেই অসাধারণ পথ ধরতে হয়েছে। এই অসাধারণ পথের অপর নাম গণ-অভ্যুত্থান। অধ্যাপক খানের দৃষ্টিতে, ১৮৫৭, ১৯০৫, ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪-এর গণ-আভ্যুত্থান অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই ইতিহাস বিশ্লেষণে তিনি কোনো সরলীকরণে যাননি; দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ঔপনিবেশিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে তিনি অভ্যুত্থান-পরবর্তী নানা সংকটকে ‘সংকটের আলামত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যার ইতিহাস বহু প্রাচীন।

তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, অধ্যাপক খান বাংলাদেশের মৌলিক কিছু সংকটের মূল কারণ খুঁজেছেন। রাষ্টের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির জটিলতাগুলোর ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বংশানুক্রমিক বিশ্লেষণে তার দক্ষতা এখানে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মনে করেন, লুটপাট ও দখলদারত্বে তৈরী ‘পুঁজির আদিম সঞ্চয়ন’ প্রক্রিয়াই স্বৈরাচারী শাসনের জন্ম দেয়, যা একই সঙ্গে ‘উন্নয়ন অর্থনীতির’ রাজনৈতিক পূর্বশর্তও। এই শাসনের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করেও মৌলিক সংকটের নিরসন না হওয়ায় গণ-অভ্যুত্থান ‘বেহাত বিপ্লব’এ পরিণত হয়। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কি গণ-অভ্যুত্থান, নাকি বিপ্লব?’—এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি ১৯৭১ সালও কি প্রকৃত বিপ্লব ছিল কিনা, তাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

প্রকৃতপক্ষে, বইয়ের নামকরণের পেছনে জার্মান তাত্ত্বিক বাল্টার বেনিয়ামিনের দর্শনের প্রভাব সুস্পষ্ট। মার্ক্সের ‘বিপ্লব ইতিহাসের ইঞ্জিন’ তত্ত্বকে উল্টে বেনিয়ামিন বলেছিলেন, বিপ্লব হলো প্রগতির ধ্বংসগামী ট্রেনে ইমার্জেন্সি ব্রেক টানার এক ঘটনা। অধ্যাপক খানের মতে, ২০২৪ সালের ঘটনাধারা নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলেও পুরাতনের ফাটল ভালোমতোই দেখিয়ে দিয়েছে। পেরোনো নিয়মের ধ্বংস ও নতুন নিয়মের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এই ধারণা থেকেই ‘রতি ও বিরতি’ নামটি এসেছে।