কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার উত্তর ভবানীপুর গ্রাম সংলগ্ন খরিলার বিলে প্রতিদিন শত শত কৃষক ও শ্রমিক কাজ করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে ধান রোপণ, পাট ধোয়া ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকেন তারা। কিন্তু কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম নেওয়ার বা আকস্মিক ঝড়বৃষ্টি থেকে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো স্থান নেই তাদের। বিলের মধুপুর-বরইচারা জিকে খালের কালভার্টের পাশে ৯টি পাকা খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে—এগুলো ছিল একসময় কৃষকদের জন্য তৈরি ‘জিরানোর ঘর’র ভিত্তি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে টিনশেড ছাউনিটি নির্মাণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, কৃষকেরা এখানে বসে খাবার খেতে, বিশ্রাম নিতে এবং নামাজ পড়তে পারবেন। কিন্তু ২০২০ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে টিনের চাল পুরোপুরি উড়ে যায়। সেই থেকে ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ঘরটিতে নতুন চাল বসেনি।

সোমবার দুপুরে খরিলার বিলে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে কাজ করছেন কৃষকেরা। কেউ ধানের চারা রোপণ করছেন, কেউ খালের পানিতে পাট ধুতে ব্যস্ত। চালহীন ঘরের ভেতরে শুকাতে দেওয়া হয়েছে কিছু পাটকাঠি। যে ঘরটি একসময় কৃষকদের আশ্রয় ছিল, সেটি এখন আর কোনো কাজে আসে না। বরইচারা গ্রামের কৃষক চয়েন উদ্দিন বলেন, “ঝড়বৃষ্টি আসলেই হুট করে বাড়ির দিকে ছুটতে হয়। খোলা মাঠে বজ্রপাতের ভয়। ছাদটা ঠিক করে দিলে অন্তত একটা আশ্রয় হতো।” আমগাছের ছায়ায় বসে নিজের আক্ষেপের কথা বলছিলেন উত্তর ভবানীপুর গ্রামের কৃষক দুলাল সেখ। তাঁর ভাষ্য, “এই বিলে হাজার হাজার বিঘা জমি। প্রতিদিন শত শত লোক খাটতে আসে। আগে কাজের ফাঁকে এই ঘরে একটু বসতাম, খাওয়াদাওয়া করতাম, নামাজ পড়তাম। আম্ফানের পর থেকে চাল নাই। সারা দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে খাটতে হয়। দুপুরবেলা একটু জিরানোর জায়গা পর্যন্ত নাই।” মাঠে কাজ করার সময় অন্য এক কষ্টের কথাও তুলে ধরলেন কৃষক বদর উদ্দিন। তাঁর কাদামাখা হাত দুটি দেখিয়ে তিনি বলেন, “মাঠে চারদিকে কাদা। একটু যে শান্তিমতো নামাজ পড়ব, সে জায়গাও তো নাই। সরকারের কাছে একটাই দাবি—ঘরটার চালটা যেন তাড়াতাড়ি বানিয়ে দেয়।”

কৃষকদের এই দুর্ভোগের কথা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অজানা নয়। যদুবয়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান জানান, ঘরটি আগের চেয়ারম্যানের সময়ে নির্মিত হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ে চাল উড়ে যাওয়ার পর সেখানে স্থায়ী ও পাকা ছাদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কুমারখালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওছার আলী বলেন, মাঠে কাজের ফাঁকে কৃষকদের বিশ্রাম ও নিরাপত্তার জন্য এমন ছাউনি প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে বলে জানান কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেখানে স্থায়ী চাল নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।