প্রায় দুই যুগ আগে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে পৌঁছান বাকপ্রতিবন্ধী ববি বেগম। সেদিন এক দুপুরে ট্রেন থেকে নেমে আর কোথাও না গিয়ে স্টেশনকেই নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেন তিনি। বিনা পারিশ্রমিকে প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার, শৌচাগারসহ অন্যান্য পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন এই নারী। এখন তাঁর বয়স প্রায় ৭০ বছর। বার্ধক্যের কারণে দুর্বল হয়ে পড়লেও স্টেশন কর্তৃপক্ষ মানবিক বিবেচনায় একটি পরিত্যক্ত কক্ষে থাকার সুযোগ দিয়েছে। স্টেশন এলাকার মানুষ ও যাত্রীরা তাঁকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ পাঁচ-দশ টাকা করে সহায়তা করতেন। সেই টাকাই সঞ্চয় করে রেখেছিলেন তিনি প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে। গত শনিবার রাতে সেই জমানো টাকার জন্য হামলার শিকার হন ববি বেগম। স্টেশনের পরিত্যক্ত কক্ষে ঢুকে একদল দুর্বৃত্ত তাঁকে মারধর করে এবং সঞ্চিত অর্থ লুট করে নিয়ে যায়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানান। ইতিমধ্যে প্রশাসন, পুলিশ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ববি বেগম অন্তত দুই দশক ধরে এ স্টেশনে পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। তাঁর আপন বলতে কেউ না থাকায় স্টেশনের ছোট কক্ষেই থাকতেন তিনি। বাকপ্রতিবন্ধকতা ও বয়স সত্ত্বেও নিয়মিত স্টেশন পরিষ্কার করতেন। যাত্রীদের দেওয়া টাকা তিনি সেই কক্ষেই জমিয়ে রাখতেন। গত শনিবার রাত প্রায় দুইটার দিকে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন কয়েকজন দুর্বৃত্ত কক্ষে ঢুকে টাকা দাবি করে। অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে চোখ-মুখে ঘুষি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। পরে কক্ষে লুকিয়ে রাখা সঞ্চয় খুঁজে নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। সকালে ঘটনাটি জানাজানি হলে মেথিকান্দা রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার এস এম জসিম জানান, পুলিশ ও প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে। রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তিন থেকে চারজন মাদকাসক্তকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, ববি বেগমের সার্বিক দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসন নিয়েছে। তাঁকে চাল-ডালসহ শুকনা খাবার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনি যেন জীবনের বাকি সময় স্টেশনের ওই কক্ষেই নিরাপদে থাকতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে।