আজ ১৬ আগস্ট। ১৯৭৭ সালের এই দিনে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছিলেন রক অ্যান্ড রোলের সম্রাট হিসেবে পরিচিত এলভিস প্রিসলি। মৃত্যুর ৪৯ বছর পরও সংগীতপ্রেমীদের মনে তাঁর আসন এতটাই দৃঢ় যে, শুধু ‘এলভিস’ নামটিই যথেষ্ট—তার আগে বা পরে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। তাঁকে ঘিরে যে ‘দ্য কিং’ উপাধি, তা নিছক জনপ্রিয়তার প্রতীক নয়; বরং সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে পোশাক, নাচ, টেলিভিশন, সিনেমা এমনকি ব্যক্তিত্ব প্রকাশের ধরন পর্যন্ত বিস্তৃত এক সাংস্কৃতিক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বীকৃতি।

১৯৫৪ সালে, যখন তিনি সান রেকর্ডসে ‘দ্যাটস অল রাইট’ গানটি রেকর্ড করেন, তখন তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অখ্যাত। কিন্তু সেই রেকর্ডেই যেন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত ছিল। এটি ছিল পুরোনো আমেরিকান সংগীতের নানা ধারা—ব্লুজ, কান্ট্রি, আরঅ্যান্ডবি, গসপেল—নতুন প্রজন্মের শরীরী ছন্দ ও উত্তেজনার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার এক অভিনব প্রয়াস। ১৯৫৫ সালে আরসিএর সাথে চুক্তির পর ১৯৫৬ সালের শুরুতে ‘হার্টব্রেক হোটেল’ তাঁকে জাতীয় তারকায় পরিণত করে; গানটি অল্প সময়ে ১০ লাখ কপি বিক্রি করেছিল। কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি কখনো কোনো একক ঘরানায় আটকে থাকেননি; বরং তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ঘরানার সীমা ভাঙা। ‘হাউন্ড ডগ’, ‘জেলহাউস রক’-এর মতো উন্মাদনাপূর্ণ গানের পাশাপাশি ‘লাভ মি টেন্ডার’, ‘আর ইউ লোনসাম টুনাইট?’-এর মতো নরম সুরও ছিল তাঁর ঝুলিতে।

এলভিসের গান যতটা বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তাঁর মঞ্চে শরীরী ভাষা সম্ভবত তার চেয়েও বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৫০-এর দশকের রক্ষণশীল আমেরিকায় কোমর দোলানো, শরীর বাঁকানো, চোখ ও মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে গানকে অভিনয়ে রূপ দেওয়া—এসব ছিল অনেকের চোখে অশ্লীল। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ তাঁর নড়াচড়া নিয়ে আপত্তি তুললেও নিষেধাজ্ঞা যত বেড়েছে, দর্শকের কৌতূহলও তত বেড়েছে। আজকের মিউজিক ভিডিও বা কোরিওগ্রাফ করা স্টেজ পারফরম্যান্সে শিল্পীর শরীরকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার অন্যতম পথিকৃৎ এলভিস। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, গান শুধু শোনার নয়, দেখারও বিষয়। তাঁর আঁটসাঁট প্যান্ট, পম্পাডোর চুল, সাইডবার্ন—সব মিলিয়ে তিনি তরুণ পুরুষের প্রচলিত চেহারাকে বদলে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ঝলমলে জাম্পস্যুট, কেপ, গয়নায় সজ্জিত হয়ে তিনি ‘এজি হিলবিলি ক্যাট’ থেকে হয়ে উঠেছিলেন এক নাটকীয় শোম্যান।

এলভিসের সাফল্যের আরেকটি রহস্য ছিল সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম টেলিভিশনকে বুঝে ফেলা। রেকর্ড বিক্রি তাঁকে তারকা বানালেও, টেলিভিশন তাঁকে পৌঁছে দেয় ঘরে ঘরে। ১৯৬৮ সালের ‘এলভিস’, ১৯৭৩ সালের ‘আলোহা ফ্রম হাওয়াই, ভায়া স্যাটেলাইট’ এবং ‘এলভিস ইন কনসার্ট’—এই তিনটি বিশেষ অনুষ্ঠান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একসঙ্গে কনসার্ট পৌঁছে দেওয়া তখন ছিল অভাবনীয় ঘটনা, যা আজকের লাইভ স্ট্রিমিং যুগের পূর্বসূরি।

তবে সংগীতে ঝুঁকি নিলেও সিনেমার পর্দায় তাঁকে তেমন স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। ৩১টি ফিচার চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও অধিকাংশই ছিল ফর্মুলাভিত্তিক—গান, রোমান্স আর হাস্যরসের নিরাপদ সমন্বয়। ফলে তাঁর অভিনয় প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি বলে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যায়ন করে থাকেন সমালোচকরা। ষাটের দশকের মাঝামাঝি ক্যারিয়ারে স্থবিরতা এলেও ১৯৬৮ সালের ‘কামব্যাক কনসার্ট’ তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করে। কালো চামড়ার পোশাকে ঘনিষ্ঠ পরিবেশে গাওয়া সেই কনসার্ট প্রমাণ করে, কিংবদন্তি হয়ে থাকতে হলে নিজেকে নতুন করে সাজাতে হয়। এরপর লাস ভেগাসে শুরু হয় তাঁর মঞ্চজীবনের নতুন অধ্যায়, যেখানে তিনি ছিলেন বিশাল ব্যান্ড, অর্কেস্ট্রা ও ঝলমলে আলোর কেন্দ্রবিন্দু।

তবে কিংবদন্তির এই উজ্জ্বল পথের পাশেই রয়েছে ছায়াও। এলভিসের শেষ জীবন ছিল প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নির্ভরতা, অতিরিক্ত ওজন ও অনিয়মিত জীবনযাপনে জর্জরিত। তাঁর ম্যানেজার কর্নেল টম পার্কারের সঙ্গে সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়েও বহু প্রশ্ন আছে। আর সবচেয়ে বড় যে বিতর্কটি তাঁকে ঘিরে আজও টিকে আছে, তা হলো—কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতের স্রষ্টাদের কাছ থেকে তিনি কতটুকু ঋণ নিয়েছেন? বর্ণবৈষম্যে বিভক্ত সেই সমাজে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের তৈরি ব্লুজ, আরঅ্যান্ডবি ও গসপেল যখন শ্বেতাঙ্গ শিল্পীর কণ্ঠে মূলধারায় প্রবেশ করে, তখন অর্থনৈতিক লাভ ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্নটি জটিল আকার নেয়। তবে তাঁর জীবনী বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন এবং মেমফিসের কৃষ্ণাঙ্গ সংবাদপত্রগুলো তাঁকে অনেক সময় সম্ভাব্য মিত্র হিসেবেও দেখেছিল।

মৃত্যুর পর এলভিসের প্রভাব যেন আরও শক্তিশালী হয়েছে। গ্রেসল্যান্ড শুধু একটি বাড়ি নয়, হয়ে উঠেছে তাঁর ব্যক্তিত্বের সম্প্রসারণ ও পর্যটনের কেন্দ্র। তাঁর রেকর্ডের বিশ্বব্যাপী বিক্রি এক বিলিয়নেরও বেশি বলে অনুমান করা হয়, যা ভিনাইল থেকে ডিজিটাল যুগেও সমান তালে বিক্রি হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর চেহারা, ভঙ্গি ও সরল শক্তিশালী গানগুলো সহজেই পৌঁছে যায়। দারিদ্র্য থেকে খ্যাতি, পুনরুত্থান থেকে পতন—এলভিসের জীবন নিজেই এক পূর্ণাঙ্গ নাটক। তাই ২০২৬ সালেও গ্রেসল্যান্ডে ‘আলটিমেট এলভিস ট্রিবিউট আর্টিস্ট কনটেস্ট’ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে নতুন প্রজন্মের পারফরমাররা তাঁর কণ্ঠ, পোশাক ও শরীরী ভাষা পুনর্নির্মাণ করে উদযাপন করছে তাঁর উত্তরাধিকার। একজন শিল্পীর মৃত্যুর ৪৯ বছর পরও এই চর্চা প্রমাণ করে, এলভিস এখন আর শুধু একজন মানুষ নন—তিনি এক চিরস্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রতীক।