জাপানে বর্তমানে যে ভয়াবহ গ্রীষ্মকাল চলছে, তা শুধু আরেকটি অস্বাভাবিক গরমের মৌসুম নয়—বরং এটি বিশ্বের অন্যতম উন্নত জলবায়ু অভিযোজন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। তাপমাত্রা যখন বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়, তখন মার্কিন নেতা ও কোম্পানিগুলো জাপানের এই কৌশল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি টোকিওতে পৌঁছে লেখক ৩৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মুখোমুখি হন, যা প্রায় 'কোকুশোবি' বা 'নিষ্ঠুর গরমের দিন' হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পথে। এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠলে জনগণকে সতর্ক করার জন্য এই বিশেষ পদবি চালু করেছে জাপান। শুধু তাপপ্রবাহই নয়, এ বছর চিবা প্রিফেকচারে ঐতিহাসিক বন্যায় অন্তত ৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং বহু মানুষ আটকা পড়েছিলেন।

ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, সুনামি, টাইফুন, তাপপ্রবাহ ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জাপান দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত। কিন্তু তারপরও এই লড়াই সহজ নয়। জাপানের প্রায় প্রতিটি পরিবারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেও ইউরোপের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ পরিবারের কাছে এই সুবিধা রয়েছে। সুইস রে-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান তাপপ্রবাহের ধাক্কা সামলানোর জন্য ইউরোপের বেশিরভাগ অংশই প্রস্তুত নয়।

জাপানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি পরিবর্তন করা। দীর্ঘদিন ধরে এখানে পুরুষদের স্যুট পরার এবং নারীদের স্টকিং ও আনুষ্ঠানিক স্কার্ট পরার রীতি প্রচলিত। রেকর্ড তাপপ্রবাহ ও ইরানের জ্বালানি সংকটের মধ্যেও শহর কর্তৃপক্ষের প্রচারণা সত্ত্বেও প্রচুর মানুষ জ্যাকেট-টাই পরে অফিসে যাচ্ছেন। তবে গত বছর সরকার কর্মক্ষেত্রে হিটস্ট্রোক প্রতিরোধের নিয়ম জোরদার করেছে, যাতে নিয়োগকর্তাদের রিপোর্টিং, কুলিং এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করতে হয়।

নিয়োগকর্তারাও সাড়া দিচ্ছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওবায়াশি কর্প তার নির্মাণকাজ এ বছর তাপ-প্রবণ স্থানে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সরিয়ে নিয়েছে, যা আগে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলত। সেবু রেলওয়ে ফ্রিজারসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্রামকক্ষ স্থাপন করেছে। কোম্পানিগুলো এখন কুলিং গার্মেন্টস, স্যাল্ট ট্যাবলেট, ফ্যান ও তাপ পর্যবেক্ষণ ডিভাইস বিতরণ করছে। কৃষিতে শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জাপান ক্রমবর্ধমানভাবে রোবট ব্যবহার করছে, যা তাপ-প্রতিরোধী শ্রমিক তৈরির অতিরিক্ত সুবিধাও দিচ্ছে।

তবে শুধু কাজের সময় বা ক্রীড়া টুর্নামেন্ট পুনর্নির্ধারণ, উষ্ণ সমুদ্রে ফসল বা মাছ ধরার পদ্ধতি পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপগুলো চরম আবহাওয়ার মূল কারণ বা সামগ্রিক ঝুঁকি কমায় না। অ্যালিয়ানজের মতে, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে তাপ-সম্পর্কিত জিডিপি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, যা ৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যবসায়িক যুক্তি স্পষ্ট হলেও, বেসরকারি খাত, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, এই বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। ওয়াশিংটনে জলবায়ু নীতিমালা প্রত্যাহার, ইএসজি-বিরোধী প্রতিক্রিয়া বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান নির্গমনের সংবেদনশীলতা এর কারণ হতে পারে।

জাপান বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একমত হওয়ার অপেক্ষা না করে নিজেকে অভিযোজিত করার পথ বেছে নিয়েছে। মার্কিন ব্যবসায়ী নেতাদের জন্য প্রশ্ন হলো, তারা একই কাজ শুরু করার আগে কতটা তাপ সহ্য করতে পারবেন।