বিশ্ব মাদক বিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রথম আলো ট্রাস্ট আয়োজিত ১৭৮তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভায় মাদকাসক্তির চিকিৎসায় আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট শিশু-কিশোর ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল আহমেদ। গত ২৫ জুন প্রথম আলোর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সভায় ‘বিশ্ব মাদক সমস্যা: চলমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী ফলাফল’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য বিষয়টি সামনে রাখা হয়।

মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম উদ্ভাবন সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. আহমেদ জানান, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে মানসিকতার জায়গায়—যাকে ‘প্যারাডাইম শিফট’ বলা হয়। তাঁর মতে, সমাজের ধারণা যে মাদক সেবনকারী একজন অপরাধী, তা পুরোপুরি ভুল। চিকিৎসা বিজ্ঞান স্পষ্ট করে বলে—মাদকাসক্ত কোনো অপরাধী নয়, বরং সে পরিস্থিতির শিকার একজন রোগী এবং মাদকাসক্তি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি। যতক্ষণ না আমরা মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে দেখা বন্ধ করব, ততক্ষণ কোনো কার্যকর ফলাফল আসবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডা. আহমেদ উদাহরণ দিয়ে বলেন, হাত-পা ভেঙে গেলে কাউকে চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয় না। ঠিক তেমনি মাদকাসক্তির কারণে কাউকে সমাজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা যাবে না। বরং তাকে রোগী জ্ঞান করে সহানুভূতির সঙ্গে চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে তিনি সমাজভিত্তিক চিকিৎসা বা ‘কমিউনিটি বেজড ট্রিটমেন্ট’-এর কথা উল্লেখ করেন। বর্তমানে অনেকেই মনে করেন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ধরে কোনো রিহাব সেন্টার বা হাসপাতালে ছয় মাস বা নয় মাস বন্দি করে চিকিৎসা করতে হবে। কিন্তু এই বন্দিজীবন অনেক সময় রোগীর মানবাধিকারের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি বলছে, রোগীকে তার পরিবার ও সমাজের ভেতরে রেখেই, চাকরি, পড়ালেখা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রেখেই চিকিৎসা সম্ভব এবং এটি অনেক বেশি কার্যকর। থাইল্যান্ড ও জাপানের মতো দেশে এই মডেল সফলভাবে কার্যকর রয়েছে বলে জানান ডা. আহমেদ।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক ঐক্য ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি প্রবল। বন্যা, খরা বা কোভিড মহামারির সময় মানুষ কীভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে তা আমরা দেখেছি। মাদকের বিরুদ্ধেও যদি আমরা সেই সমাজভিত্তিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারি, তাহলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে পরিবারের পরিমণ্ডলে রেখেই তার চিকিৎসা করা সম্ভব হবে। তিনি একে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও উদ্ভাবনী মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।