‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের লেখক রকিব হাসান প্রয়াত হয়েছেন ১৫ অক্টোবর। কখনো সরাসরি দেখা বা কথা না হলেও, এই সংবাদটি তাঁর এক পাঠকের মনকে বিষণ্ণতায় ভরিয়ে দিয়েছে। স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠেছে কিশোর বয়সের সেই দিনগুলো, যে সময়টায় ইন্টারনেটের বদলে বই ছিল অবসরের প্রধান সঙ্গী। মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা সেই পাঠকের কাছে মুঠোফোন বলতে তখন কেবল ‘বাটন ফোন’–ই পরিচিত ছিল, ফলে খেলাধুলার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসই দখল করেছিল তার সময়।

রকিব হাসানের সৃষ্ট চরিত্র কিশোর পাশার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে। তখন লেখক গ্রামে থাকেন, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সামনে বৃত্তি পরীক্ষা, পরিবার ও শিক্ষকদের ক্রমাগত ‘পড়তে বসো’র চাপে অতিষ্ঠ অবস্থা। নিয়মিত সকাল-বিকেল প্রাইভেট টিউটরের আগমন এবং কোচিংয়ের মডেল টেস্টের ব্যস্ততা চলছিল। কিন্তু ‘পড়াচোর’ স্বভাবের কারণে পাঠ্যবইয়ের আড়ালে গল্পের বই পড়াই ছিল তার মুক্তির পথ। একদিন ভ্রাম্যমাণ ভাঙারির দোকানি আসার সংকেত—ছিদ্র করা বোতলে মার্বেল বেঁধে তৈরি খটখট শব্দ—শুনেই তিনি দৌড়ে বেরিয়ে যান।

তবে তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন; দুই টাকার বুটভাজা কেনা, যা ছিল বেশ মুখরোচক ও সস্তা খাবার। হঠাৎই পুরোনো বই-খাতা রাখা চাঙাড়ির ওপর চোখ আটকে যায়। একটি পুরোনো, মলিন বইয়ের পেছনে লেখা ছিল, ‘হ্যাল্লো কিশোর বন্ধুরা—আমি কিশোর পাশা বলছি আমেরিকার রকি বিচ থেকে...’। গোয়েন্দা কাহিনির সঙ্গে তখনো কোনো পরিচয় না থাকলেও, কৌতূহল জাগে। পকেটে থাকা বুটভাজার জন্য বরাদ্দ পুরো দুই টাকা দোকানি কাকুকে দিয়ে বইটি চাইতেই, দোকানি কোনো অর্থ নিতে রাজি হননি। সম্ভবত তিনি বলেছিলেন, ‘টাকা লাগবে না, নিয়ে নে’। সেই দোকানির কাছে ময়লা বইটির আর্থিক মূল্য না থাকলেও, অজান্তেই তিনি একজন কিশোরের হাতে তুলে দিয়েছিলেন গোয়েন্দা হওয়ার স্বপ্ন এবং একজন নিবেদিত পাঠক হয়ে ওঠার মূল উপাদান।

বাড়ি ফিরে এক রাতে লুকিয়ে বইটি পড়া হয়। পরিণতিতে পরদিন কোচিংয়ের মডেল টেস্টে কম নম্বর পাওয়া এবং বাড়িতে ব্যাপক বকুনি খাওয়া হয়। এরপর একে একে রকিব হাসানের জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, আর সে হয়ে ওঠে ‘তিন গোয়েন্দা’র একনিষ্ঠ পাঠক। তার সূত্রেই যমজ বন্ধু লিমন ও ইমনও কিশোর পাশা, মুসা ও রবিনের ভক্ত হয়ে যায়। গ্রামের বাড়ির পাশে বয়ে যাওয়া হরিহর নদের তীরে তিন বন্ধু প্রায় বিকেলেই গল্প পড়ে আলোচনা করত। ইমন একদিন নিজেদের একটি গোয়েন্দা সংস্থা খোলার প্রস্তাব দিলেও, কে কোন চরিত্র হবে—এ প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি হয়। লেখক মনে মনে দুঁদে গোয়েন্দা হওয়ার স্বপ্ন লালন করলেও, মুখ ফুটে কোনো চরিত্র বেছে নেননি। লিমন ও ইমনের মধ্যে কিশোর পাশা চরিত্রটি নিয়ে দেনদরবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোয় তাদের সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

তবু, ছেলেবেলার প্রতিটি আনন্দের পরতে পরতে কিশোর পাশা, মুসা ও রবিন জড়িয়ে ছিল। রকিব হাসানের সহজ-সুন্দর বর্ণনা সেই আনন্দকে আরও গভীর করেছিল। তার ‘তিন গোয়েন্দা’ সৃষ্টি না করলে শৈশবের স্মৃতিতে হয়তো কিছুটা ফাঁক থেকে যেত। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতোই পৃথিবীর চিরন্তন সত্য হলো সবাইকে একদিন চলে যেতে হয়। কিন্তু রকিব হাসানের মতো সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বরা তাঁদের চরিত্রের মাঝেই চিরভাস্বর হয়ে থাকেন। কিশোর পাশা, মুসা আর রবিনের ভেতর দিয়েই তিনি আলোকিত থাকবেন। ছেলেবেলার আনন্দের পরিধি বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই লেখকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।