পৃথিবীর সব প্রেমকাহিনি সুখাবসান পায় না। অনেক সময় দুইজনের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতির জটিলতায় সম্পর্ক টিকে না। জনপ্রিয় নাটক 'বড় ছেলে'তেও এমন এক চিত্র দেখা গিয়েছিল, যেখানে গভীর ভালোবাসা সত্ত্বেও পরিণতি অধরা থেকে যায়। পরকীয়া বা তুচ্ছ ঘটনা থেকেও সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটতে পারে। চারপাশে প্রায়শই দেখা যায়, বিচ্ছেদের পর শ্রদ্ধাবোধ উধাও হয়ে গেছে, সম্বোধন ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ হয়ে ওঠে, এবং দ্বন্দ্ব সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রোশবশত কেউ কেউ প্রতিপক্ষের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করে না, যা সংবাদপত্রের পাতায়ও উঠে আসে।

এমন প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তানজির আহম্মদ ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রকৃত ভালোবাসার মূলমন্ত্র হলো অপর মানুষটির মঙ্গল কামনা। ফলে বিচ্ছেদের পরেও সেই শুভেচ্ছা বজায় রাখাই কাম্য। অনেকে আবেগ সামলাতে না পারার শঙ্কায় প্রাক্তনের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় বা কথোপকথন এড়িয়ে চলেন। তবে যদি মুখোমুখি হয়ে যেতে হয়, তাহলে অন্তত সংক্ষিপ্ত সৌজন্যমূলক বাক্যালাপ করা কর্তব্য। একটি সাধারণ হাসিও এক্ষেত্রে বিনয়ের প্রকাশক হতে পারে বলে তিনি মত দেন।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, যে সম্পর্ক টেকেনি, তাকে সম্মান প্রদর্শনের যুক্তি কী? জীবনের নানা প্রয়াসে যেমন সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই, ভালোবাসলেই যে চিরকাল একসঙ্গে থাকা সম্ভব, তারও কোনো স্থিরতা নেই। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস 'দ্য ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি' থেকে পাওয়া দর্শনটি প্রযোজ্য—ফলাফল যা-ই আসুক, নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রয়েছে স্বয়ংসিদ্ধতা। প্রেমের ক্ষেত্রেও সত্যিকার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে অবিরাম ভালোবাসতে পারার সক্ষমতার মাঝে।

মনোবিদ নাদিয়া নাসরিন জোর দিয়ে বলেন, এই কঠিন সময়ে নিজের অনুভূতির যত্ন নেওয়া এবং বিচ্ছেদকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি। মানসিক চাপমুক্ত থাকতে বিশ্বস্ত কোনো বন্ধু বা আপনজনের সাথে নিজের অনুভূতি ভাগাভাগি করে নেওয়া উচিত। তবে সেই কাছের মানুষটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজস্ব বিবেচনাশক্তি প্রয়োগ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, সম্পর্ক ভাঙার পর একে অপরকে নিয়ে কুৎসা রটালে বা কাদা ছোড়াছুড়ি করলে, আপনার অনুপস্থিতিতেও অন্যরা আপনার বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারে। তাই নিজের ভাবমূর্তি ইতিবাচক রাখার স্বার্থেও এমন অপপ্রচার থেকে বিরত থাকা উচিত। বরং এ সময়ে উপলব্ধি করা প্রয়োজন, বিচ্ছিন্ন সম্পর্কটি প্রকৃত অর্থে ভালোবাসা ছিল কি না, কারণ ভালোবাসা একটি অনির্বচনীয় সত্যের মতো, সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি তার অন্তর্ধানের প্রমাণ নয়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো রেলগাড়ির কামরায় না হলেও, জীবনের যেকোনো প্রান্তে হঠাৎ প্রাক্তনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। স্বপ্নভঙ্গের পর এমন আকস্মিক সাক্ষাতের মুহূর্তে অনেকেই নিজেকে গুছিয়ে রাখতে পারেন না। অভিযোগ ও আক্রোশে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার দৃষ্টান্তও মেলে, যা অত্যন্ত অনুচিত। সেই সাথে এহেন পরিস্থিতিতে আবেগের বশবর্তী হয়ে পড়াও বেমানান।

বিশেষজ্ঞদের উপদেশ হলো, প্রথমত নিজের প্রতি যত্নবান হতে হবে। পরিপাটি ও আত্মবিশ্বাসী চেহারা ফুটিয়ে তোলার জন্য উপযুক্ত পোশাক ও সতেজতা বজায় রাখা জরুরি। আকস্মিক সাক্ষাতে নিজের অবস্থা নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। দ্বিতীয়ত, চিন্তার জগতেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। বিচ্ছেদের পর থেকেই মানুষটিকে মানসিকভাবে জীবন থেকে ‘মুছে’ ফেলা উচিত। যদি তার স্মৃতি চিন্তাচেতনায় অনবরত অবস্থান করে, তবে দেখা হওয়ার মুহূর্তে আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এটা মনে রাখতে হবে, কোনো কিছু ভেঙে গেলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই পুনর্মিলনের প্রত্যাশা পোষণ না করে বিচ্ছেদকে মেনে নেওয়া মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে।

প্রাক্তনের সামনে পড়লে মুখ নিচু করে কিংবা না-দেখার ভান করে চলে যাওয়া সঠিক আচরণ নয়। বরং স্বাভাবিক থেকে তার কাছাকাছি যাওয়াই উত্তম। কণ্ঠের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে শান্ত স্বরে সংক্ষিপ্ত বাক্য বিনিময় করা যেতে পারে। এই কথোপকথনে বিনয় ও ভদ্রতা অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি আক্ষেপ, অভিযোগ বা বেদনার সুর যাতে প্রবেশ না করে, সে দিকেও নজর দিতে হবে। সাধারণ সৌজন্য ও শুভকামনা বিনিময় আপনার প্রকৃত ভালোবাসার পরিচয় দেবে। মৃদু হাসির মাধ্যমে আলাপচারিতা শেষ করা যেতে পারে, তবে দীর্ঘ সময় ধরে গল্পগুজব করার প্রয়োজন নেই।