পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা ধরে রাখতে খাদ্যতালিকায় আঁশ ও প্রোবায়োটিক—দুটিরই প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু 'গাট হেলথ' বা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের প্রকৃত রক্ষাকবচ কোনটি, এই দ্বিধা অনেকের মনেই কাজ করে। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, একটি সুস্থ পরিপাকতন্ত্রের ভিত রচনায় প্রোবায়োটিকের তুলনায় আঁশ অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও ফলপ্রসূ।

উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা আঁশ হলো এমন এক কার্বোহাইড্রেইট যা দেহ সরাসরি পরিপাক করতে পারে না। তবে এটিই অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের প্রধান খাদ্য হিসেবে কাজ করে। মার্কিন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. উইল বুলসিউইচ ব্যাখ্যা করেন, বৈচিত্র্যময় খাবার থেকে পাওয়া আঁশ যখন কোলোনে পৌঁছায়, তখন ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে তার গাঁজন সংঘটিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড, যা অন্ত্রের প্রতিরক্ষা দেওয়াল মজবুত করে জীবাণুর হাত থেকে শরীরকে বাঁচায়। পুষ্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'জোই'-এর প্রধান পুষ্টিবিদ ডা. ফেডেরিকা আমাতি যোগ করেন, "আঁশ সরাসরি রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ, কলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করে।"

আঁশ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। দ্রবণীয় আঁশ পানিতে মিশে যায় এবং হজমে বিলম্ব ঘটায়, যা রক্তে সুগার ও কলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে এবং ডায়রিয়া প্রতিরোধে কার্যকর। অন্যদিকে, অদ্রবণীয় আঁশ পানি শোষণ করে না। এটি মলকে নরম ও ভারি করে অন্ত্রের গতি বাড়ায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

অপরদিকে, প্রোবায়োটিক হলো সজীব অনুজীব বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান হাসপাতালের ডা. ফেলিস শ্নল-সুসম্যান জানান, ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম, আলসারেটিভ কোলাইটিস বা তীব্র ডায়রিয়ার মতো নির্দিষ্ট কিছু রোগে প্রোবায়োটিক বেশ কার্যকর। অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়ার পর অন্তত্-এর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য ফেরাতেও এটি সহায়ক। কিন্তু ডা. বুলসিউইচ সতর্ক করে বলেছেন, "প্রোবায়োটিক হলো সাময়িক 'সাহায্যকারী সেনা'; দীর্ঘদিন এরা অন্তত্-এ টিকে থাকে না। পর্যাপ্ত আঁশ ছাড়া প্রোবায়োটিক সঠিক ভূমিকা পালন করতে অক্ষম। খাদ্যহীন ও দুর্বল অন্তত্-এ প্রোবায়োটিক ঢুকালে প্রত্যাশিত ফল মেলে না।"

বিশেষজ্ঞদের সম্মিলিত মূল্যায়ন হলো, অন্ত্রের সার্বিক সুস্থতার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হলো আঁশ। প্রোবায়োটিকের ফলাফল ব্যক্তির শরীর, মাত্রা ও স্ট্রেইনের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু আঁশের উপকারিতা সবার জন্যই প্রমাণিত ও দীর্ঘস্থায়ী। তাদের পরামর্শ হলো, প্রতিদিনের খাবারে ফল, সবজি, ডাল, বাদাম ও ওটসের মতো বিভিন্ন ধরনের আঁশযুক্ত খাদ্য রাখতে হবে। তবে আঁশের পরিমাণ আচমকা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, নাহলে পেট ফাঁপা বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হতে পারে। একই সাথে পর্যাপ্ত পানি পানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, কৌশল হিসেবে প্রথমেই আঁশসমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করা উচিত। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক নির্দিষ্ট প্রয়োজনে প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে। যদি পরিপাকতন্ত্রকে একটি বাগিচা কল্পনা করা হয়, তবে আঁশ হল তার মৃত্তিকার সার আর প্রোবায়োটিক হলো বীজ। তাই বীজ বোনার আগে মাটির উর্বরতা সুনিশ্চিত করাটা অপরিহার্য।