বর্তমান সময়ে অনেক মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের সন্তানদের কাছ থেকে একটি সাধারণ অভিযোগ শোনা যায়—'আমার মা-বাবা সারাক্ষণ ফেসবুকে ডুবে থাকেন'। অথচ কিছুদিন আগেও সন্তানদের অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন অভিভাবকরা। এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে। তবে শুধু ফেসবুক ব্যবহার করাই যে সমস্যার লক্ষণ নয়, তা স্পষ্ট করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যখন এটি বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, দৈনন্দিন দায়িত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখনই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কখন বুঝবেন যে এটি আসক্তিতে পরিণত হয়েছে? বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—বারবার ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করেও না পারা, ফেসবুক ব্যবহার করতে না পারলে অস্থির বা বিরক্ত হয়ে পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে ফোনে ব্যস্ত থাকা, খাওয়া বা আড্ডার মাঝেও বারবার ফেসবুক দেখা, বাস্তব জীবনের চেয়ে অনলাইন যোগাযোগে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়া, এবং সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা।

এই অভ্যাসের কারণে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। একই ঘরে থেকেও অনেক সময় কথাবার্তা কমে যায়। বিশেষ করে দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে নাতি-নাতনিদের সময় কাটানোর সুযোগ হ্রাস পায়। পরিবার নিয়ে বাইরে ঘুরতে গেলেও যদি বেশির ভাগ সময় ফোনেই কাটে, তাহলে বাস্তব মুহূর্তগুলো উপভোগ করার সুযোগ কমে যায়।

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম বড় সমস্যা হলো ভুয়া তথ্য ও গুজব। অনেক সময় আবেগঘন বা চাঞ্চল্যকর পোস্ট, পুরোনো ছবি, বিকৃত ভিডিও বা বানানো তথ্য সত্যতা যাচাই না করেই শেয়ার করা হয়। এতে ভুল তথ্য আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো তথ্য বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে অন্তত একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সূত্র থেকে যাচাই করা উচিত।

অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকিও বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে প্রতারকরা নানা কৌশল প্রয়োগ করে—যেমন ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব, লটারিতে জেতার দাবি, মেসেঞ্জারে পরিচিত সেজে টাকা চাওয়া, বা ভুয়া অনলাইন শপ। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অপরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংকিং তথ্য শেয়ার করা এবং যাচাই না করে টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভুয়া তথ্য আরেকটি মারাত্মক সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় 'সাত দিনে ডায়াবেটিস ভালো হবে', 'হাঁটুর ব্যথা একেবারে সারবে', 'ক্যানসারের ঘরোয়া চিকিৎসা', বা 'হার্টের ব্লক দূর করার' মতো দাবি। এসব পোস্ট দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা ভেষজ পণ্য ব্যবহার শুরু করা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই কোনো স্বাস্থ্য-পরামর্শ গ্রহণের আগে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন ফেসবুক এত আকর্ষণীয় লাগে? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নতুন নোটিফিকেশন, লাইক, মন্তব্য বা ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। সেই অনুভূতি আবার পেতে অনেকেই অজান্তেই বারবার ফোন হাতে নেন। পাশাপাশি, ফেসবুকের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ বুঝে একই ধরনের আরও কনটেন্ট দেখায়। ফলে পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিলেও কখন যে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা কেটে যায়, তা টের পাওয়া যায় না।

এ ধরনের সমস্যা সমাধানে রাগারাগি বা অভিযোগ সাধারণত উল্টো ফল দেয়। 'তুমি সারাক্ষণ ফেসবুকে থাকো'—এভাবে বলার বদলে ইতিবাচকভাবে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন—একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া, নাতি-নাতনির সঙ্গে খেলতে উৎসাহ দেওয়া, পরিবারের সবাই মিলে গল্প বা বোর্ড গেম খেলা, অথবা পুরোনো ছবি দেখে স্মৃতিচারণা করা। অনেক সময় বিকল্প আনন্দের সুযোগ তৈরি হলে ফোনের ব্যবহারও কমে আসে।

পরিবারে কিছু নিয়ম করা যেতে পারে—যেমন খাওয়ার টেবিলে ফোন ব্যবহার না করা, পরিবারের আড্ডার সময় ফোন না দেখা, ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখা, সপ্তাহে অন্তত এক দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিরতি নেওয়া, এবং ফোনের স্ক্রিন টাইম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে সীমা নির্ধারণ করা।

যদি অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের কারণে পারিবারিক সম্পর্ক, ঘুম, কাজ বা মানসিক স্বাস্থ্যে স্পষ্ট প্রভাব পড়ে এবং নিজে থেকে ব্যবহার কমানো সম্ভব না হয়, তাহলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ফেসবুক নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই, যখন এটি বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য, নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়।