সব সরকারের আমলেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অনীহা প্রকটভাবে বিদ্যমান। গণমাধ্যমে আদিবাসীদের যে রঙিন ও উৎসবমুখর চিত্র তুলে ধরা হয়, তার আড়ালে তাদের নারীদের জীবনসংগ্রামের করুণ চিত্রটি কখনোই ফুটে ওঠে না। ভূমি দখলের ঘটনায় সৃষ্ট নৈরাজ্যের সময় আদিবাসী নারীরাই প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। সোমবার বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি বলেন, নানা রকম পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিতে হলে সকলকে একতাবদ্ধভাবে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু তার স্বাগত বক্তব্যে আদিবাসী নারীদের অত্যন্ত প্রান্তিক অবস্থানে থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একাধারে নারী এবং অন্যদিকে আদিবাসী পরিচয়ের কারণে তারা দ্বিগুণ বৈষম্য, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এএলএআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, জাতিগতভাবে আমরা এক ধরনের আস্থার সংকটে ভুগছি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বাস্তবায়নে সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। অপরদিকে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অধিকারের প্রশ্নে কাজ করার সময় এখনো অনেকের মধ্যে বৈষম্যমূলক পক্ষপাত লক্ষ করা যায়। জাতিসংঘ আদিবাসী দিবস ঘোষণা করলেও আদিবাসীদের প্রান্তিক হিসেবেই চিহ্নিত করে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, আদিবাসী ইস্যুতে রাষ্ট্রের অনীহা প্রতিটি শাসনামলেই পরিলক্ষিত হয়েছে।

‘বৈচিত্র্য হুমকি নয়, বরং শক্তি’— এই প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন মানবাধিকারকর্মী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপায়ন খীসা। তিনি বলেন, উচ্চপদে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই যে নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে তা বলা যাবে না। কারণ একটি নারীবিরোধী সংস্কৃতির মধ্যেই আমরা সবাই বসবাস করছি।

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফাল্গুনী ত্রিপুরা লিখিত বক্তব্যে আদিবাসী নারীদের সংগ্রামী জীবনের দিকটি গণমাধ্যমে না তুলে ধরার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আদিবাসীদের বর্ণিল ছবির আড়ালে তাদের নারীদের লড়াকু জীবনের চিত্র কখনোই উপস্থাপিত হয় না। ভূমি দখলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিভিন্ন অরাজকতায় আদিবাসী নারীরাই প্রধান টার্গেট হয়ে থাকে। তিনি সহিংসতা প্রতিরোধ, ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন, ভূমি কমিশন গঠন, মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাসহ ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র পরিষদের অর্থবিষয়ক সম্পাদক জানকী চিসিম, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের মনিরা ত্রিপুরা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যা, স্টেপসের চন্দন লাহিড়ী এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সিননোমে মারমা। সূচনা অংশে ‘ত্রিপুরা আদিবাসীদের কাথারক’ নৃত্য পরিবেশন করা হয়।