রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশের সময় বাংলার আধুনিক রাজনৈতিক ভাষা তার শৈশবকাল পার করছিল। তরুণ রবীন্দ্রনাথের লেখায় 'শব্দপ্রিয়তার' যুগ ছিল, এবং ১৮৮০-এর দশকে কলকাতার নৈমিত্তিক রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁর অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। যদিও রাজনীতি তাঁর সর্বগ্রাসী আগ্রহের বিষয় ছিল না, তবুও অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি একজন মূল চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হন। এর প্রধান কারণ ছিল রাজনীতির ভাষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি স্বাধীনতা, রাষ্ট্র, জাতি, সমাজ-এর মতো ধারণাগুলোর অর্থ ও ব্যবহারের মধ্যে যে জটিলতা ও অসামঞ্জস্য ছিল তা চিহ্নিত করতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। সমকালীন বাংলার 'স্বাধীনতা'-দর্শনকে তিনি 'কুড়িয়ে পাওয়া শব্দ' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং আধুনিক 'পলিটিকস'-এর সঙ্গে রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী অর্থের অমিল তাঁকে ভাবিত করেছিল।
উনিশ শতকের শেষ সিকিতে ঔপনিবেশিক বাংলায় স্বদেশ সন্ধানের প্রশ্নটি নতুন ছিল না। ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রতিশ্রুতি ও সাম্রাজ্যের ছায়ায় বসে বাংলার সুধীসমাজ স্বদেশপ্রেম বা স্বদেশ-বাৎসল্যবোধে মগ্ন ছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের মতো চিন্তাবিদরাও একই প্রশ্নে উদ্বিগ্ন ছিলেন। বঙ্কিম ইংরেজি 'প্যাট্রিয়টিজম'-এর সাথে স্বদেশপ্রীতির সমার্থকতা স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না, কারণ তিনি মনে করতেন ইউরোপীয় প্যাট্রিয়টিজম অপরকে দমন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবৃত্তি। বঙ্কিমের ধর্মতত্ত্বে স্বদেশপ্রীতিকে 'জাগতিক প্রীতির' উচ্চ শিখর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের 'লোকহিত' ধারণার বিরোধিতা করেন। ১৮৮৪ সালের একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, 'লোক' বলতে বর্তমানের বিপুল লোক ও ভবিষ্যতের অগণ্য লোক বোঝায় এবং এত লোকের হিত মিথ্যার দ্বারা হতে পারে না, কারণ মিথ্যা সীমাবদ্ধ।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তার একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হলো ১৯০৪ সালে (১৩১১ বঙ্গাব্দ) রচিত 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধ। স্বদেশি আন্দোলনের সময় এটি বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশের আগে জনসমক্ষে পঠিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের মতে, ভারতবর্ষের মামলা আলাদা; এখানে সমাজের নিজস্ব একটি গতি আছে। যৌথ জীবনের প্রয়োজনগুলো সামাজিকভাবে এক 'আশ্চর্য্যরূপে, বিচিত্ররূপে' সাধিত হয়, যেখানে সমাজ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং রাষ্ট্র কেবল একটি বহিরঙ্গের ব্যাপার। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের মতো রবীন্দ্রনাথও মনে করতেন যে ভারতবর্ষে যুগযুগান্ত নানা শাসকের বদল হলেও সমাজের নিজস্ব স্বাধীনতা কখনো খর্ব হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ স্বদেশকে জাতি, সম্প্রদায় বা লোকের মতো প্রচলিত ধারণা দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। বরং, তাঁর স্বদেশসন্ধান শুরু হয়েছিল রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক সম্পর্কের সমীকরণকে এক পাশে সরিয়ে। এই জিজ্ঞাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে স্বদেশিযুগের গান ও সাহিত্যে, যা স্বদেশকে প্রেম ও সাধনার একটি নতুন ভাষায় বোধগম্য করে তোলে। 'আমার সোনার বাংলা', 'ও আমার দেশের মাটি', 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে'—এই গানগুলোতে সমাজের পূর্ণতা ও ঐক্যগুণ 'মা' ডাকে ভূষিত হয়। এই স্বদেশপ্রেমের ভাষায় গৌরবের বাহুল্য নেই, বরং আছে প্রকৃতির রূপক ও আত্মশক্তির প্রতিশ্রুতি। ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের দার্শনিক ভিত্তি 'Universal Humanity' ধারণাটি রবীন্দ্রনাথের 'বিচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যস্থাপন'-এর ভাবনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল, যা স্বদেশের অবয়ব নিয়ে তাঁর দ্বিধার সাময়িক সমাধান দেয়।
ভারতবর্ষের রাজনীতিকে শুধু সমাজের মধ্যে আবদ্ধ রাখার এই ধারণা সমসাময়িক রাজনৈতিক চেতনার ধারকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথের 'ন্যাশনালিজম' বক্তৃতাও পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে একই সমালোচনার শিকার হয় এবং বহুদিন তাঁর নামের সাথে 'অ্যান্টি-পলিটিক্যাল' তকমা লেগে থাকে। তবে, রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নগুলো ছিল বনিয়াদি এবং চিন্তার প্রাথমিক অনুমান নিয়ে। তিনি আধুনিক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে সন্দিহান থাকলেও আধুনিকতার ছায়াতল সম্পূর্ণ ছেড়ে যাননি। তাঁর স্বদেশসন্ধান ও প্রাপ্তির ফল সুদূরপ্রসারী ছিল, যা একদা বাংলার জাতীয়তাবাদে মিশে গিয়ে তাকে রূপান্তরিত করেছিল।


