২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরিয়ে অন্য কাউকে প্রধান উপদেষ্টা করার চেষ্টা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সে সময়ের নানা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

আসিফ নজরুল বলেন, ৬ আগস্ট সকালে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে তার আলাদা বৈঠক হয়। সেনাপ্রধান ইউনূসের বিষয়ে দুটি আপত্তি তোলেন—শ্রম আইনের মামলায় দণ্ডিত হওয়া এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ। আসিফ নজরুল তাকে বোঝান যে এগুলো আওয়ামী লীগের প্রচার এবং ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি। সেনাপ্রধান পরে সম্মত হন, তবে সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের বৈঠকে অন্যরকম ঘটনা ঘটে।

ওই বৈঠকে ছাত্রদের উপস্থিতিতে সেনাপ্রধান আবার ইউনূস বাদে অন্য কাউকে প্রধান করার প্রস্তাব দেন। এমনকি ছাত্রদের নিজেদেরই দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ছাত্ররা অনড় থাকে। আসিফ নজরুল জানান, ছাত্ররা ইউনূস ছাড়া কারও ব্যাপারে রাজি হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধান তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

সরকার পতনের দিন ৫ আগস্টের ঘটনা প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, সেনা সদরে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে তিনিই একমাত্র নাগরিক প্রতিনিধি ছিলেন। সেখানে সংসদ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং রাজবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে ঐকমত্য হয়। পরে রাতে কার্জন হলে ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠকে ইউনূসের নাম প্রথম ওঠে। নাহিদ ইসলাম জানান, তারা ইতিমধ্যে ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তিনি রাজি আছেন।

উপদেষ্টা তালিকা প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, ৭ আগস্ট রাতে ছাত্ররা তার বাসায় এসে তালিকা নিয়ে আলোচনা করে। তিনি রিজওয়ানা হাসান, সালেহউদ্দিন আহমেদ ও তৌহিদ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন, যা ইতিমধ্যে তাদের তালিকায় ছিল। আর্মির পক্ষ থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমানের নাম প্রস্তাব করা হয়। ড. ইউনূস নিজেও কয়েকজন নারীর নাম পাঠিয়েছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, বহু বছর পর মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, গুম-খুনের বিচার শুরু হয়েছে এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এসেছে। তবে মব নিয়ন্ত্রণ, মামলায় ভুয়া আসামি রাখার সংস্কৃতি এবং ৩২ নম্বর ভাঙা রোধে ব্যর্থতা ছিল। হামের টিকা সংকটেও ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা পূরণ নিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন হয়েছে, ভোটাধিকার এসেছে, গুম বন্ধ হয়েছে। তবে প্রান্তিক মানুষের জন্য আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন। কৃতিত্ব নিয়ে কাড়াকাড়িকে তিনি মজ্জাগত অভ্যাস বলে উল্লেখ করেন।