যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর মেজর লিগ সকার (MLS) নিজেদের জনপ্রিয়তা ও রাজস্ব বাড়ানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ দেখছে। সম্প্রতি বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ জাতীয় দল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর, ফক্স স্পোর্টসের ধারাভাষ্যকার জন স্ট্রং ৩০ মিলিয়ন দর্শকের কাছে সরাসরি আবেদন জানান। তিনি সিয়াটেলের লুমেন ফিল্ডে ৬৬,৯২৫ জন দর্শকের উপস্থিতিতে বলেন, ‘আপনারা যদি যা দেখছেন তা উপভোগ করে থাকেন, তাহলে নিজের স্থানীয় দলকে সমর্থন করুন। এই সুন্দর খেলাটি শেষ দেখা নয়।’ সিয়াটেল সাউন্ডার্সের গড় দর্শকসংখ্যা ৩১,০০০ হলেও বিশ্বকাপের ম্যাচে উপস্থিতি ছিল তার দ্বিগুণেরও বেশি। এমএলএস দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব ফুটবলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার ক্রীড়াঙ্গনে একপ্রকার গৌণ অবস্থানে ছিল। তবে লিগটি মনে করছে, এই বিশ্বকাপ—ঠিক ১৯৯৪ সালের মতো—এমএলএস-এর জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। লিগের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা ক্যামিলো দুরানা বলেন, ‘বিশ্বকাপ অনুরাগ ও সচেতনতার প্রাথমিক স্তর গড়তে সহায়তা করবে, আর এটাকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করাই আমাদের কাজ।’ ইতিমধ্যেই ৩০টি ক্লাবের প্রতিটি কমপক্ষে ৫০০,০০০ ডলার বিনিয়োগ করেছে একটি বিজ্ঞাপন প্রচারে, যেখানে স্লোগান দেওয়া হয়েছে, ‘ধন্যবাদ বিশ্ব, আমরা এখন থেকে হাল ধরছি।’ ২২টি দল নতুন ভক্তদের আকৃষ্ট করতে ‘প্রথম ম্যাচ আমাদের পক্ষ থেকে’ অফার দিয়ে বিনামূল্যে টিকিট দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকারদের একাংশ মনে করেন, এমএলএস-এর ক্লাবগুলোর মূল্যায়ন অত্যন্ত দ্রুত বেড়েছে, যা তাদের আর্থিক ভিত্তির তুলনায় অনেক বেশি। স্পোর্টিং কানসাস সিটি সম্প্রতি প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে। এমএলএস-এর ৩০টি ফ্র্যাঞ্চাইজির গড় মূল্য এখন ৭৩১ মিলিয়ন ডলার, যা এক দশক আগে ছিল ১৮৫ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বের ৩০টি সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবল দলের মধ্যে সাতটিই এমএলএস-এর, যার মধ্যে ইন্টার মায়ামি ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যে এনএইচএল-এর দুইটি দলকে ছাড়িয়ে গেছে এবং কয়েকটি এমএলবি ফ্র্যাঞ্চাইজির কাছাকাছি অবস্থান করছে। তবে স্পোর্টস ব্ল্যাকব্রিজের প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার জার্ভিসের মতে, ‘আমি যাদের সঙ্গে কথা বলি, তাদের অনেকেই ঘরোয়া বাজার থেকে দামের কারণে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। যারা এই খাতে অনেক টাকা করেছেন, তারা ১০-২০ বছর আগে এসেছিলেন।’ তবে এমএলএস-এর ব্যবসা কিছু খাতে উন্নতি করেছে, বিশেষ করে ইন্টার মায়ামি। মেসির আগমনের আগে ২০২২ সালে যার আয় ছিল ৫৬ মিলিয়ন ডলার, তা গত মৌসুমে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ মিলিয়ন ডলারে। দুরানা বলেন, ‘লোকেরা ধরে নিয়েছিল লিওনেল মেসি এখানে অবসর নিতে আসবেন—তিনি ঠিক তার উল্টোটা করেছেন। তিনি সর্বোচ্চ স্তরে প্রতিযোগিতা করছেন।’ মেসি সম্প্রতি ইন্টার মায়ামির সঙ্গে ২০২৮ মৌসুম পর্যন্ত চুক্তি বাড়িয়েছেন। এমএলএস আরও শক্তিশালী হয়েছে এলএএফসি-তে সন হিউং-মিনের যোগ দেওয়া এবং আঁতোয়ান গ্রিজমান ও রবার্ট লেভানডোস্কির চুক্তির মাধ্যমে। ভিলানোভার স্পোর্টস বিজনেস অধ্যাপক ব্রেট মায়ার্স বলেন, ‘মেসির মতো প্রভাব ফেলতে পারে এমন খেলোয়াড় পাওয়া কঠিন, তবে ভালো খেলোয়াড়রা তাকে অনুসরণ করতে চান। আমাদের জীবনের মান অন্যদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।’ বিগত ১১ বছরে এমএলএস ১২টি সম্প্রসারণ দল যুক্ত করেছে, যার মধ্যে সাতটি লিগের সবচেয়ে মূল্যবান দশটির মধ্যে রয়েছে। সান দিয়েগো এফসি সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিয়ন ডলার সম্প্রসারণ ফি দিয়ে লিগে প্রবেশ করে। ইন্টার মায়ামির নতুন এনইউ স্টেডিয়াম ও নিউ ইয়র্ক সিটি এফসি-র নতুন মাঠ ভবিষ্যৎ আয়ের নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ফুটবলের তুলনায় এমএলএস-এর বড় সুবিধা হলো রেলিগেশন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, যা দলের আয় হ্রাসের ঝুঁকি কমায়। তবে রাজস্বের দিক থেকে এমএলএস এখনও পিছিয়ে; ইভারটন ও ফুলহ্যামের মতো মিড-টেবিল প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবগুলোর বার্ষিক আয় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। গত মৌসুমে এমএলএস-এর গড় দর্শকসংখ্যা ছিল ২২,০০০, যা ২০২৪ সালের রেকর্ড ২৩,৩০০ থেকে কম। অ্যাটলান্টা ইউনাইটেড এফসি বাদে অধিকাংশ দলই তাদের স্টেডিয়ামের অর্ধেকেরও কম আসন পূর্ণ করতে পারছে। টেলিভিশন দর্শক সংখ্যাও চ্যালেঞ্জিং। অ্যাপল টিভিতে এমএলএস গেমসের গড় দর্শক ছিল ১২০,০০০, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫০% বেশি, কিন্তু ‘ডাবল পেওয়াল’ মডেলের কারণে সীমিত ছিল। সম্প্রতি লিগ অ্যাপল টিভি চুক্তি ২০২৯ সাল পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত করেছে। এক ক্রীড়া বিনিয়োগ ব্যাংকার বলেন, ‘এমএলএস স্বীকার করবে যে অ্যাপল অংশীদারিত্ব প্রথম দিকে প্রত্যাশা পূরণ করেনি। ২০২৯ সালের পুনর্নবীকরণে এটি সংশোধনের সুযোগ আছে।’ তবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা সন্দেহ করেন যে এনএফএল, এমএলবি-র মতো লিগের সঙ্গে নতুন চুক্তির সময় এমএলএস-এর জন্য কত টাকা বাকি থাকবে। কিছু বিনিয়োগকারী এখন মেক্সিকোর লিগা এমএক্স-এ বেশি লাভজনক সুযোগ খুঁজছেন। ২০২৫ সালে এমএলএস-এর ৩০টি দলের মধ্যে ১৯টি পরিচালনগত ভিত্তিতে লোকসান করেছে বলে ফোর্বসের হিসাব। ভ্যানকুভার হোয়াইটক্যাপস, যার মূল্য ৪৪৫ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সাল থেকে বিক্রির জন্য রয়েছে। ক্লাবের সিইও অ্যাক্সেল শুস্টার জানান, ‘এই মুহূর্তে এই ক্লাবের ১% কিনতেও কেউ আগ্রহী নয়।’ এপ্রিলে এক গ্রুপ দলটি কিনে লাস ভেগাসে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তা এখনও অনিশ্চিত। বিলিয়নিয়ার জন ফিশারও স্যান হোসে আর্থকোয়েকস বিক্রির জন্য রেখেছেন। এই দুই ক্লাবের বিক্রি লিগের আর্থিক নিম্নসীমা নির্ধারণ করবে; যতদিন এগুলো বিক্রি না হবে, ততদিন লিগের মূল্যায়ন বুদ্বুদের ধারণা বাড়বে।
বিশ্বকাপকে পুঁজি করে বড় লাভের আশা এমএলএস-এর, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ
মেজর লিগ সকার (MLS) বিশ্বকাপের মাধ্যমে ঘরোয়া ফুটবলে নতুন সমর্থক ও রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে লিগের দ্রুত মূল্যায়ন ও রাজস্ব চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সন্দিহান। ইন্টার মায়ামি সাফল্য দেখালেও, ভ্যানকুভারের মতো দল বিক্রি হচ্ছে না, যা লিগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

