রাজধানী ঢাকার পাঁচটি এলাকা সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ 'হটস্পট' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একটি বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, গত সাড়ে ছয় বছরের ব্যবধানে মহানগরীতে প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২০ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের জুলাই শেষ পর্যন্ত ঢাকায় মোট ১,৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলোতে ১,৩৮৪ জন নিহত এবং ২,৪৮৮ জন আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশুও রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো, প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের প্রায় ৮২ শতাংশই হলেন পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। অর্থাৎ, সড়কের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। সংস্থাটি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড এবং বিমানবন্দর সড়ককে সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

দিনের কোন সময়টা সবচেয়ে মরনঘাতী, সে বিষয়েও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। পরিসংখ্যান বলছে, রাতের আঁধারই সবচেয়ে বড় কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। ৫১৯ জন (৩৭.৫%) প্রাণ হারিয়েছেন রাতে, আর ভোরে ১৪২ জন (১০.২৬%) এবং সকালের দিকে ২৫৮ জন (১৮.৬৪%) নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ, রাত থেকে সকালের মধ্যেই দুর্ঘটনার পরিমান সবচেয়ে বেশি। এই সময় ফাঁকা রাস্তায় মালবাহী ভারী যানবাহন এবং অন্যান্য চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর সুযোগ পান। রাস্তা পারাপারের সময় পথচারীরাই তখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন।

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, দীর্ঘক্ষন যানজটের মধ্যে আটকে থাকার ফলে চালকদের মানসিকতা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান এই বিষয়ে বলেন, ‘সিগন্যাল ছেড়ে দেওয়ার পরই চালকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তাছাড়া রাত ও ভোরে ফাঁকা সড়কে এবং যাত্রী তোলার পাল্লাপাল্লির প্রতিযোগিতায় বাসগুলোর চালকেরা বড় ধরনের ঝুকি সৃষ্টি করেন। এ কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।’

ঢাকায় যানচলাচলের নিম্নগতি প্রসঙ্গেও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ২০২৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, নগরীতে বাসের গড়গতি মাত্র ৯.৭ কিমি/ঘন্টা, যা সাইকেল বা রিকশার গতির সমতুল্য। অফিস সময়ের চাপে এই গতি ৫ থেকে ৭ কিমি/ঘন্টায় নেমে আসে। পূর্বে করা বাংলাদেশ প্রোকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণা বলেছিল, ২০০৭ সালে ঢাকার গড় গতি ছিল ২১ কিমি/ঘন্টা, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৮ কিমি/ঘন্টায়। মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতিও বর্তমানে ৪.১৫ কিমি/ঘন্টা। এমন নিম্নগতির একটি শহরে এত উচ্চ মৃত্যুহার অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং চালকদের ধৈর্যহীনতাই এর জন্য দায়ী।

দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত যানবহনের প্রকারভেদেও রয়েছে স্পষ্ট চিত্র। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-পিকআপ-ট্যাংকার-ময়লাবাহী ট্রাক ৩৩.২৫% এবং মোটরসাইকেল ২৬% দুর্ঘটনায় যুক্ত। এরপরেই আছে বাস, যা ২১.৭৫% দুর্ঘটনায় জড়িত। সাইদুর রহমান রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙখলা ফেরাতে রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর তাগিদ দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই বহুমুখি সংকট উত্তরণ সম্ভব।’