২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২টি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের বাসিন্দারা পেয়েছিলেন প্রকৃত নাগরিকত্ব। এগারো বছর পর সেই বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো, বিশেষ করে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়ার চিত্র এখন কেমন, তা জানার চেষ্টা করেছে প্রতিবেদক। গত ২৫ জুলাই কালীরহাট বাজারে সাইকেল মেকানিক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে আলাপ হয়। সিরাজুল ইসলামের বর্ণনায়, ২০১৫ সালের পূর্বে তারা প্রকৃত মানুষের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ছিটমহল বিনিময়ের ফলে তাদের নাম মানুষের খাতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিগত ১১ বছরে দাসিয়ারছড়ার ভৌত অবকাঠামোয় দৃশ্যত পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ সড়ক পাকা করা হয়েছে, প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছেছে এবং নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রসুল আলী এক চায়ের দোকানে বসে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আগে কেউ মন খুলে হাসতে পারত না, কিন্তু এখন তারা নির্দ্বিধায় হাসতে পারেন। এই রূপান্তরের গভীরতা অনুধাবনের জন্য অতীতের প্রেক্ষাপট দেখা প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে এক দেশের অভ্যন্তরে অন্য দেশের এই বিচ্ছিন্ন ভূমিগুলোয় বসবাসরত ৫১ হাজারেরও বেশি অধিবাসীকে চরম অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। নাগরিক সুবিধা বলতে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, বিদ্যালয়-কলেজ, হাসপাতাল বা নিরাপদ যাতায়াত— কোনোটিই তাদের জন্য সহজলভ্য ছিল না।

ছিটমহলবাসীরা নিজ প্রধান ভূখণ্ডে যেতে ভীষণ ঝুঁকির মুখোমুখি হতেন। দৈনন্দিন জীবনে বাজারে পণ্য বিক্রি করতেও তাদের বিশেষণ করা হতো ‘ছিটের মানুষ’ বলে, যার কারণে পণ্যের দামও পাওয়া যেত কম। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অনেকেই পরিচয় গোপন করতেন, প্রতিবেশী এলাকার কাউকে বাবা-মা সাজিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র বানাতেন কিংবা ভিন্ন ঠিকানায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে বাধ্য হতেন। তবে বড় ছিটমহলগুলোর কোনো কোনো স্থানে বসবাসকারীরা নিজ উদ্যোগে সীমিত শাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। দাসিয়ারছড়ায় প্রায় ৮-১০ হাজার মানুষের উদ্যোগে একটি স্থানীয় বিচার ব্যাবস্থা ও টিনের ঘরের তৈরি কারাগারও চালু ছিল বলে জানা যায়। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিন্তকারী বাহিনীর অনুপস্থিতির কারণে কিছু কিছু ছিটমহলে চোরাচালান, মাদকের ব্যবসা ও জুয়ার আসর গড়ে উঠার ঘটনাও নথিভুক্ত আছে।

ছিটমহল বিনিময়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটির শুরু হয়েছিল বহু আগে। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নুন ও ভারতের নেহরু একটি সমঝোতায় পৌঁছালেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হয়। এতে বাসিন্দাদের নিজ বসতভিটায় থাকা কিংবা পছন্দের দেশে পাড়ি জমানোর সুযোগ দেওয়া হয়। বেশিরভাগই নিজ ভিটায় থেকে যান, কিন্তু কিছু পরিবার ভারতে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় সাত দশকব্যাপী ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার পরিসমাপ্তি ঘটে। বর্তমানে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের অধিকাংশই নাগরিক হিসেবে মর্যাদা ফিরে পাওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বসিত, তবে ভূমি ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কিছু জটিলতা এখনও সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি।

বিনিময়ের সময় যেসব পরিবার দাসিয়ারছড়া ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন, তাদের একজন নজরুল ইসলাম সম্প্রতি মাসখানেকের জন্য নিজেদের পূর্ব বসতভিটায় বেড়াতে এসেছেন। হাবিবুর রহমানের দোকানের সামনে বসে তিনি জানালেন, চেনা জন্মভূমি ছাড়ার পর অনেকেই নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা সেখানকার জীবনযাত্রায় ততটা সহজে মানিয়ে নিতে সক্ষম হননি, যতটা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পেরেছেন। সুযোগ পেলেই তাঁদের অনেকেই আবার বাংলাদেশে ফিরে আসতে চান। তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরূপ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, তাঁরা এখন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। স্বল্প সময়ের মধ্যে এত উন্নয়ন হবে তাঁরা প্রত্যাশা করেননি। ভূমি ও নাগরিকত্বের ক্ষুদ্র কিছু জটিলতা সরকারের সহায়তায় শীঘ্রই মিটবে বলে তাঁর বিশ্বাস।