লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরের নৌপথে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগদান করেছে বাংলাদেশ। রিয়াদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতির মাধ্যমে ১৪ দেশের এই জোট গঠনের তথ্য জানায়। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে প্রথম আলোকে ঢাকার অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জোট গঠনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে রিয়াদের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের ডাকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন যে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই উদ্যোগ নিয়ে ঢাকার সাথে আলোচনা চালিয়ে আসছিল সৌদি আরব। সরকারি একটি সূত্র অনুসারে, প্রস্তাবটি গভীর পর্যালোচনা করার পরই বাংলাদেশ এতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশ ছাড়াও তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও নাইজেরিয়া এই জোটের সদস্য। আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জোট গঠনের আলোচনায় ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যার মধ্যে ৪৩টি অংশ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ দেশের সমন্বয়ে এই প্রতিরক্ষা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই জোট গঠনের পেছনে প্রধান অনুপ্রেরণা হলো ইরান যুদ্ধের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ বহনকারী হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরব বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর ব্যবহার শুরু করেছিল। সৌদি পূর্বাঞ্চলের তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে এনে সেখান থেকে রপ্তানি করা হচ্ছিল। কিন্তু ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি গোষ্ঠী সম্প্রতি সৌদি আরবের ওপর নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং সৌদি জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালাতে থাকে। বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ প্রবাহিত হয় মাত্র ২৯ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে। এই পথটি ব্যাহত হলে বিশ্বজ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। এই প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলার তাগিদ থেকেই রিয়াদ নতুন জোটের পরিকল্পনা নেয়।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ভারত মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সম্পূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা বিধান এবং সামুদ্রিক হুমকি মোকাবেলায় সহযোগিতা ও সমন্বয় হবে এই জোটের মূল ভিত্তি। সদস্যদেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা, সামরিক মহড়া ও সমুদ্রে যৌথ টহল পরিচালনা করবে। তবে সদস্যরা কী ধরনের নৌ-যান বা বিমান সরবরাহ করবে এবং জোটের সদর দপ্তর সৌদি আরবের কোথায় হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। বাব আল-মানদেব প্রণালির এক প্রান্তে থাকা জিবুতি এ জোটের সদস্য হওয়ায় সৌদি আরব কিছুটা কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে, যদিও জোটটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে টার্গেট করবে না বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও আলোচনায় আমন্ত্রিত ছিল, তবে লোহিত সাগরে তাদের নিজস্ব নৌ নিরাপত্তা কার্যক্রম চালু থাকায় সৌদি জোটের সঙ্গে তদের ভূমিকা কী হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। জোটে আরও নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান এই যোগদানকে পর্যালোচনাসাপেক্ষ বলে মন্তব্য করেছেবেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "বাংলাদেশ অতীতে কোনো সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়নি। প্রথমবার যুক্ত হয়ে কোনো সংঘাতে যাতে বাংলাদেশ না জড়ায়, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে।" ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে এবং পুরো অঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও স্বার্থ জড়িত থাকায় এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সৌদি নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি সামরিক জোটে (আইএমসিটিসি) যোগ দিলেও, রিয়াদের জোট সদর দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিদল পাঠায়নি ঢাকা। পরবর্তীতে সৌদি আরব বাংলাদেশকে সক্রিয় উপস্থিতি ও প্রতিনিধিদল পাঠানোর তাগিদ দিয়েছিল।