খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বড়বাড়ি গ্রামে অবস্থিত বুরুজপোতা ঢিবিটি রাজা প্রতাপাদিত্যের দুর্গের প্রাচীন ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই পুরাকীর্তি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সম্প্রতি তৎপরতা শুরু করলেও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি নিয়ে জটিলতায় সেই উদ্যোগ স্থগিত হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বড়বাড়ি গ্রামের ভেতরে বাঁশঝাড় ঘেরা এই ঢিবিটি রাস্তার সমতল থেকে এখনও ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। বিশাল আকৃতির গাব ও কাঁঠাল গাছের শিকড় প্রাচীন এই স্থাপনার ইটগুলোকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা স্তূপীকৃত প্রাচীন ইট এবং গাছের শিকড়ের ফাঁকে উঁকি দেওয়া ইটের গাঁথুনি এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের ইঙ্গিত বহন করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মধুমিতা রানীর ভাষ্য অনুযায়ী, একদা ঢিবিটি আরও অনেক উঁচু ছিল। কিন্তু ক্রমাগত বৃষ্টিপাতের ফলে ক্ষয় ও মানুষের মাটি কাটার কারণে এটি নিচু হয়ে পড়েছে। তাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে প্রচলিত গল্প থেকে জানা যায়, এটি রাজা প্রতাপাদিত্যের আমলের একটি বুরুজ বা প্রহরী চৌকি ছিল। এখানে সেনারা পাহারা দিত এবং কামানও মোতায়েন ছিল। পাশেই অবস্থিত একটি প্রাচীন মনসামন্দিরও এই লোকবিশ্বাসের সত্যতাকে দৃঢ় করে।

এলাকাবাসীর মধ্যে একটি লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে। কয়েক বছর আগে ঝড়ে ঢিবির ওপরের একটি গাবগাছ কাত হয়ে পড়লে এটি কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকজন স্থানীয় স্বপ্নে নিষেধ দেখে সেই চেষ্টা থেকে বিরত থাকেন। পরবর্তীতে গাছটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে বলে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন। এর আশপাশের বাড়িগুলোর আঙিনা, পুকুরপাড় ও কৃষিজমিতে এখনও নকশাখচিত পাথর, প্রাচীন ইট ও পুরোনো দেয়ালের ভগ্নাবশেষ মিলে যাওয়ায় পুরো গ্রাম জুড়েই একটি বিস্তৃত দুর্গ থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার ভয়াল থাবায় যখন নদীর বাঁধ ভেঙে সমগ্র এলাকা প্লাবিত হয়, তখনও এই ঢিবিটি ডোবে নাই। স্থানীয় বাসিন্দা মনোরঞ্জন মণ্ডল স্মৃতিচারণ করেন, বিপর্যয়ের সেই দিনগুলোতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অসংখ্য মানুষ এই উঁচু ভূমিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর 'যশোহর-খুলনার ইতিহাস' গ্রন্থে বেদকাশী এলাকার এই দুর্গ ও স্থাপনা ত্রাবশেষের বর্ণনা দিয়েছেন। তেমনি, 'কয়রা উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য' গ্রন্থে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবম আবদুল মালেক ব্যাখ্যা করেন, মোগল আমলে বারভূঁইয়াদের অন্যতম শাসক প্রতাপাদিত্য আনুমানিক ১৫৮৭ থেকে ১৫৯৫ সালের মধ্যে এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তার বর্ণনায় বুরুজপোতা ঢিবি ছিল দুর্গটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখান থেকেই সৈন্যরা চারপাশে নজরদারি করত এবং তোপধ্বনি করে সংকেত আদান-প্রদান করত।

দীর্ঘদিনের স্থানীয় দাবির পর প্রশাসন বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চাহিদা সাপেক্ষে উপজেলা ভূমি অফিস তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। খুলনা বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান শাহিন মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে তার কথায় স্পষ্ট, 'পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণার প্রস্তাবে ভূমির মালিকেরা সম্মতি দেননি। আর তাদের অনুমতি ছাড়া আমাদের পক্ষে সংরক্ষণের কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন।' এই জটিলতায় ইতিহাসের শেষ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বুরুজপোতা ঢিবিটি এখনও মাটির নিচের অজানা অধ্যায় প্রকাশের জন্য এক বৈজ্ঞানিক খননের অপেক্ষায় রয়েছে।