জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে, যার প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, পানিশূন্যতা এবং খাবারের মান নষ্ট হয়ে ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। পানিশূন্যতা ও ডায়রিয়া উভয় ক্ষেত্রেই খাবার স্যালাইন (ওরস্যালাইন) আক্রান্তের শরীরে শক্তি জোগায়, তবে এর প্রয়োজনীয় ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা। গত রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র তাপপ্রবাহে ওরস্যালাইন ব্যবহারে সচেতনতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। এসএমসি ওরস্যালাইন ও প্রথম আলো এই বৈঠকের আয়োজন করে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. সুকুমার রায় বলেন, ওরস্যালাইন একটি ফ্রন্টলাইন ইন্টারভেনশন, যা পরিবারের যে কেউ রোগীকে দিতে পারেন এবং এর জন্য বিশেষায়িত কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন হয় না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত ঘাম, তাপজনিত ক্লান্তি ও হিটস্ট্রোকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে ওরস্যালাইনের প্রয়োগ সম্পর্কে জনসাধারণের সচেতন থাকা জরুরি। তিনি আরও বলেন, সবাই তো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না, তাই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমন হতে হবে যাতে বিশেষজ্ঞ ছাড়াই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এজন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছানো এবং ওরস্যালাইনের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সোশ্যাল মার্কeting কোম্পানির (এসএমসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তছলিম উদ্দীন খান বলেন, সাড়ে তিন দশক আগে ওরস্যালাইন চালু হওয়ার সময় ডায়রিয়া ছিল দেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ। সরকারের প্রতিটি সময়ই ডায়রিয়া নির্মূলে খাবার স্যালাইনের ব্যবহার বিস্তৃত করতে সহযোগিতা করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত চার দশকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে—জলবায়ু পরিবর্তন। তীব্র গরমে শরীর যখন স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে না, তখন সৃষ্টি হয় হিট স্ট্রেস। খাবার স্যালাইন কীভাবে ডায়রিয়ায় মৃত্যুহার কমিয়েছে তার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, ডায়রিয়ায় মৃত্যুহার এখন ৪ শতাংশ, যেখানে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুহার ৪০ শতাংশ। ওরস্যালাইনের প্রয়োজনমাফিক ব্যবহারের কারণে এই সাফল্য এসেছে এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি আরও কমানো সম্ভব।

এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েফ উদ্দিন নাসির বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহ ও অতিবৃষ্টি—দুটো পরিস্থিতিতেই ওরস্যালাইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাপপ্রবাহে পানিশূন্যতা কাটাতে এবং অতিবৃষ্টিতে পানিবাহিত রোগের কারণে ডায়রিয়ায় এটি কার্যকর। এসএমসি দেশের প্রতিটি প্রান্তে ওরস্যালাইনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করলেও এখন সঠিক মাত্রায় ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে পানির উৎসের প্রায় ৪৭ শতাংশে ই-কোলাই জীবাণু পাওয়া যায়, যা ব্যবহারস্থলে গিয়ে ৮৫ শতাংশে পৌঁছায়। দূষিত পানি ও দুর্বল স্যানিটেশনের কারণে শিশুদের বারবার ডায়রিয়া হয়, যা অপুষ্টি ও খর্বাকৃতির ঝুঁকি বাড়ায়। তিনি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে ডায়রিয়া প্রতিরোধের প্রধান উপায় হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, তাপপ্রবাহের সময় স্কুল, বাজার ও জনসমাগমস্থলে অস্থায়ী হাইড্রেশন পয়েন্ট স্থাপন এবং সেখানে নিরাপদ পানির পাশাপাশি খাবার স্যালাইন সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

শিশুরোগবিশেষজ্ঞ ডা. তাহমীনা বেগম ওরস্যালাইন তৈরির নিয়ম তুলে ধরে বলেন, বিশুদ্ধ পানি ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত স্যালাইন মেশানো যাবে না এবং এটি আগুনে জ্বাল দেওয়া যাবে না। আধা লিটার পানিতে এক প্যাকেট স্যালাইন মিশিয়ে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার করতে হবে। কখনো এক গ্লাস পানিতে দুই চামচ বা এক লিটার পানিতে পুরো প্যাকেট মেশানো যাবে না। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক শাহনুর শারমিন হাসপাতালের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, রোগীর স্বজনেরা প্রায়ই পানির পরিমাণ ঠিকমতো দিতে পারেন না, ফলে শরীরে লবণের ভারসাম্য তৈরি হয় না।

ব্র্যাকের হেড অব ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের কর্মকর্তা সায়কা সিরাজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় অভিবাসী হয়ে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। নিম্ন আয়ের মানুষ তাপপ্রবাহে সংকটে পড়লেও ওরস্যালাইন কতটুকু খাবেন সে ব্যাপারে সচেতনতা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার মানুষ শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জড়ো হচ্ছেন এবং অতিবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ উভয়ের শিকার হচ্ছেন। হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনে শরীর নিতে না পারায় নিম্ন আয়ের মানুষ হেপাটাইটিস, টাইফয়েডে আক্রান্ত হচ্ছেন।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, খাবার স্যালাইন নিয়ে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি বেশি কথা বলা উচিত। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে পাতলা পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে ওরস্যালাইন কাজ করে না, তখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি শিশুদের মায়ের বুকের দুধ বন্ধ না করা এবং ওরস্যালাইনের পাশাপাশি স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার চিরঞ্জিত দাস বলেন, ওরস্যালাইন লাখ লাখ জীবন বাঁচিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বাঁচাবে, তবে এর যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। গোলটেবিলে ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন অভিভাবক সুচিত্রা সরকার। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।