বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী বিল অ্যাকম্যানের জীবন সম্প্রতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তাকে সামলাতে হচ্ছে এক কঠিন ব্যক্তিগত সংকট। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর ২৬ বছর বয়সী মেয়ে লুসি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকেন। প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়। এক মাস কোমায় থাকার পর লুসি চেতনা ফিরে পেলেও হারিয়েছেন তাঁর কণ্ঠস্বর ও অধিকাংশ দৃষ্টিশক্তি। অ্যাকম্যান এখন এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের সহযোগিতায় একটি অত্যাধুনিক ব্রেন ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। ইতিমধ্যেই ম্যানহাটনের পশ্চিম পাড়ায় ৪ লাখ বর্গফুটের একটি সম্পত্তি কিনেছেন তিনি, যেখানে ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও গবেষণার কেন্দ্র গড়ে উঠবে।
ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অ্যাকম্যান সম্প্রতি একটি বিরল কীর্তি স্থাপন করেছেন। তাঁর বিনিয়োগ সংস্থা পার্শিং স্কয়ারকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরিত করে এবং একইসঙ্গে একটি পাবলিকলি ট্রেডেড ফান্ড চালু করে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করেছেন। এই ঘটনাকে ওয়াল স্ট্রিটের এক অসাধারণ অধ্যায়ের সমাপ্তি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে শর্ট-সেলার ও অ্যাক্টিভিস্ট বিনিয়োগকারী হিসেবে নাম কামানো অ্যাকম্যানের ঝুলিতে রয়েছে বীমা সংস্থা এমবিআইএ-র দুর্বলতা ফাঁস ও চিপোটলের উত্থানের পূর্বাভাসের মতো সাফল্য। তবে ব্যর্থতাও কম নেই। হার্বালাইফের বিরুদ্ধে ১ বিলিয়ন ডলারের শর্ট সেলিং অভিযান ব্যর্থ হয় এবং ভ্যালিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস-এ বাজি ধরে ৪ বিলিয়ন ডলার লোকসান গুনতে হয় তাঁকে। তবুও সাবপ্রাইম বন্ধক সংকট ও কোভিড-১৯-এর মতো কালো রাজহাঁস ঘটনায় তাঁর দূরদর্শী বিনিয়োগ তাঁকে ওয়াল স্ট্রিটের অন্যতম সাহসী ঝুঁকিপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সম্প্রতি অ্যাকম্যান তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের জন্যও সমানভাবে আলোচিত। এক্স প্ল্যাটফর্মে ২৫ লাখ অনুসারী নিয়ে তিনি মুক্তমনে মতামত দিয়ে থাকেন। ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি বিতর্কে মেতে ওঠেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ক্লডিন গের গাজা যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে তাঁর সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। নিউ ইয়র্ক সিটির সমাজবাদী মেয়র জোরান মামদানিরও তিনি বড় সমালোচক। তবে এই সক্রিয়তা তাঁকে সমালোচনার মুখেও ফেলেছে। হার্ভার্ডের আরেক সাবেক সভাপতি লরেন্স সামারস অ্যাকম্যানের আচরণকে 'জো ম্যাককার্থি'র কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অ্যাকম্যান পুঁজিবাদের একজন উচ্চকিত সমর্থক। তিনি মনে করেন, মুক্ত বাজারই আমেরিকান ড্রিমের মূল ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানে সমাজে সাফল্যের প্রতি ঈর্ষা ও বিদ্বেষ বেড়ে যাওয়ায় এই ড্রিম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর শৈশবের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, 'আমার পাড়ায় কেউ করভেট গাড়ি কিনলে সবাই বলত, বাহ, দারুণ! আশা করি আমিও একদিন সফল হব।' এখন তিনি চান আমেরিকা সেই অবস্থায় ফিরুক, যেখানে মানুষের সাফল্যকে সম্মান করা হয়, হিংসা নয়।
এই দর্শন বাস্তবায়নে অ্যাকম্যান মার্কিন সরকারের জন্য 'জন্মগত বিনিয়োগ অ্যাকাউন্ট'-এর প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জন্য ইক্যুইটি ইনডেক্স ফান্ডে ৬,৭৫০ ডলার বিনিয়োগ করে দেওয়া হবে, যা করমুক্ত ৮ শতাংশ হারে চক্রবৃদ্ধি হারে ৬৫ বছর বয়সে ১০ লাখ ডলারে পরিণত হবে। ট্রাম্প প্রশাসন এই ধারণাকে স্বাগত জানিয়ে 'আমেরিকান ড্রিম অ্যাকাউন্টস' ও শিশুদের জন্য 'ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস' চালু করেছে। অ্যাকম্যানের মতে, পুঁজিবাদে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে জনগণ সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তিনি আর্থিক সাক্ষরতার জন্য নিজেই একটি ইউটিউব ভিডিও তৈরি করেছেন, যা এ পর্যন্ত ১ কোটি ৩০ লাখ বার দেখা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনের এই ট্র্যাজেডি অ্যাকম্যানের জীবনদর্শনকে আরও শাণিত করেছে। তাঁর বন্ধু ও এন্ডেভারের সহপ্রতিষ্ঠাতা লিন্ডা রটেনবার্গ বলেছেন, তিনি সবসময়ই বিশ্বকে ভালো করার প্রয়াসে চালিত। অ্যাকম্যানের ভাষ্য, জীবনের তাৎপর্য পরিমাপ করা উচিত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে কীভাবে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করা যায় দিয়ে। আর পুঁজিবাদী মডেলই এই কাজটি সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। 'জেফ বেজোস শুধু অ্যামাজন তৈরি করেই কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও সুবিধা এনেছেন,' উদাহরণ টেনে তিনি বলেন। 'আমার সামগ্রিক প্রভাব দিয়েই আমি বিচারিত হতে চাই।'




