চাঁদ থেকে ফিরে আসার পর পৃথিবীতে পা রাখতে আরও ২১ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল অ্যাপোলো-১১-এর তিন নভোচারীকে। ১৯৬৯ সালের ২৪ জুলাই প্রশান্ত মহাসাগরে নামার পর তাদের সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে আসতে দেওয়া হয়নি। চাঁদ থেকে কোনো অজানা জীবাণু বহন করে আনার শঙ্কায় তাদের রাখা হয়েছিল মোবাইল কোয়ারেন্টিন ফ্যাসিলিটিতে। সেই কেন্দ্রটি পরে হিউস্টনের লুনার রিসিভিং ল্যাবরেটরিতে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ ২১ দিন পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন, নভোচারীদের দেহে কোনো অচেনা সংক্রমণ নেই; এর পরই তারা মুক্তি পান।

অবতরণের সময়ই প্রথম বিপদের মুখে পড়েছিলেন নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন। লুনার মডিউল 'ইগল' চাঁদের দিকে নামার সময় কম্পিউটার '১২০২' ও '১২০১' কোডের সতর্কবার্তা দিতে থাকে, অর্থাৎ কম্পিউটারের ধারণক্ষমতার বাইরে চাপ পড়েছিল। হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলে তখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঠিক করতে হয়েছিল অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে নাকি বাতিল করা হবে। পূর্ববর্তী সিমুলেশনে দেখা গিয়েছিল এ ধরনের অ্যালার্ম সত্ত্বেও নিরাপদে নামা সম্ভব, তাই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সময়ে মিশন কন্ট্রোল ও মহাকাশযানের মধ্যে রেডিও সংযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল, যা ফ্লাইট ডিরেক্টর জিন ক্রানৎসকে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে ক্রমাগত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল।

অবতরণের শেষ ধাপে জ্বালানি বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তাদের একটি পাথুরে অঞ্চলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে দেখে আর্মস্ট্রং ম্যানুয়াল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মসৃণ জায়গা খুঁজতে শুরু করেন। হিউস্টন থেকে '৬০ সেকেন্ড', '৩০ সেকেন্ড' ধরে জ্বালানি শেষ হওয়ার সময় গণনা দেওয়া হচ্ছিল। নিয়মানুযায়ী এর মধ্যে নামতে না পারলে অভিযান বাতিল করতে হতো। ঠিক শেষ প্রান্তে আর্মস্ট্রং জানান, 'হিউস্টন, ট্রানকুইলিটি বেস হেয়ার। দ্য ইগল হ্যাজ ল্যান্ডেড।' মিশন কন্ট্রোলে তখন স্বস্তির ঢেউ বয়ে যায়।

চাঁদের মাটিতে পা রাখার আগে অলড্রিন একটি ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করেছিলেন, যা সে সময় নাসা প্রচার করেনি। অ্যাপোলো-৮-এর নভোচারীদের বাইবেল পাঠ নিয়ে ম্যাডালিন মারে ও'হেয়ারের মামলা চলছিল, তাই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে অলড্রিন সচেতনভাবে কমিউনিয়ন কিটের বিষয়টি উল্লেখ এড়িয়ে যান। চাঁদে পা রেখে অলড্রিনের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল 'ম্যাগনিফিসেন্ট ডেসোলেশন'—অপূর্ব শূন্যতা—শব্দ দুটি।

ফিরে আসার আগে সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি হয় অপ্রত্যাশিতভাবে। চন্দ্রপৃষ্ঠে হাঁটার পর ইগলের ভেতরে ফেরার সময় অলড্রিনের ভারী ব্যাকপ্যাকের ধাক্কায় আরোহণ ইঞ্জিনের সার্কিট ব্রেকার সুইচের প্লাস্টিকের অংশ ভেঙে যায়। এটি চালু না করলে চাঁদ থেকে ফেরা অসম্ভব ছিল। মিশন কন্ট্রোলে রাতব্যাপী চেষ্টার পরও সমাধান মেলেনি। শেষ পর্যন্ত অলড্রিন নিজেই একটি ফেল্ট-টিপ মার্কার কলমের প্লাস্টিকের ডগা ভাঙা সুইচের মধ্যে ঢুকিয়ে চাপ দেন। বৈদ্যুতিক সংযোগ ফিরে আসে, অভিযান সফল হয়। ডুরো কোম্পানির তৈরি ওই কলম ও ভাঙা সুইচটি সম্প্রতি নিউইয়র্কের সদবিস নিলামে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছে। পরবর্তী অভিযানগুলোর জন্য সুইচের ওপর প্রতিরক্ষামূলক আবরণ যুক্ত করে নাসা।

এ অভিযানের নেপথ্যে গোপন এক প্রস্তুতিও ছিল। নভোচারীরা চাঁদ থেকে ফিরতে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পক্ষে জাতির উদ্দেশে একটি শোকবার্তা পড়ার প্রস্তুতি রেখেছিলেন ভাষণ-লেখক উইলিয়াম সাফায়ার। ১৮ জুলাই তৈরি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, 'যাঁরা শান্তির খোঁজে চাঁদে গিয়েছিলেন, তাঁরাই চাঁদেই চিরনিদ্রায় শায়িত থাকবেন।' বিশেষ করে আরোহণ ইঞ্জিন ব্যর্থ হলে উদ্ধারের কোনো উপায় ছিল না। সৌভাগ্যক্রমে বিবৃতিটি ব্যবহৃত হয়নি; নথিটি তিন দশকেরও বেশি সময় অজানা ছিল, পরে ইতিহাসবিদ জেমস মান নিক্সন প্রশাসনের আর্কাইভে গবেষণাকালে এটি আবিষ্কার করেন।

অভিযান থেকে আনা প্রায় ২১ কেজি চন্দ্রপাথরের নমুনা বিশ্বের ১৩৫টি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যকে উপহার দেয় নিক্সন প্রশাসন। 'গুডউইল মুন রকস' নামের এ নমুনাগুলোর বর্তমান অবস্থান অনেকটাই অজানা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অনুসন্ধান বলছে, প্রায় ২৭০টি পাথরের অনেকগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহে বা জাদুঘরের গুদামে চাপা পড়ে আছে। নেদারল্যান্ডসে একটি ভুল বোঝাবুঝিও তৈরি হয়—সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিলেম ড্রিসকে দেওয়া একটি ব্যক্তিগত পাথর 'চাঁদের পাথর' হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছিল, কিন্তু ২০০৯ সালের পরীক্ষায় দেখা যায় সেটি অ্যারিজোনার সাধারণ পাথুরে কাঠের জীবাশ্ম, যার মূল্য মাত্র কয়েক ডলার।

অ্যাপোলো কর্মসূচি শেষ হয় ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭-এর মাধ্যমে। এরপর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী কেটে যায়। নাসার আর্টেমিস-২ অভিযান গত এপ্রিলে চার নভোচারী নিয়ে চাঁদ প্রদক্ষিণ করে ফিরে এসেছে। নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান একে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের প্রথম পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন। ২০২৮ সালের শুরুতে আর্টেমিস-৪ অভিযানে নভোচারীদের চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যেখানে আগে কখনো মানুষের পদার্পণ হয়নি।