টিনিটাস একটি লাতিন শব্দ, যার অর্থ ‘রিং’। এটি কোনো রোগ নয়, বরং অন্য কোনো সমস্যার উপসর্গ। বাইরের কোনো কোলাহল ছাড়াই নিজের কানে অস্বাভাবিক শব্দ শোনার ঘটনাকে টিনিটাস বলে। সাধারণত এক কানে এই শব্দ অনুভূত হয়, তবে দুই কানেও হতে পারে।

টিনিটাস মূলত তিন প্রকার। প্রথমটি হলো সাবজেকটিভ টিনিটাস, যেখানে রোগী বাইরের কোনো শব্দ ছাড়াই অর্থহীন শব্দ শুনতে পান। শব্দের তীব্রতা কমবেশি হতে পারে এবং তা ২৪ ঘণ্টা একটানা বা নির্দিষ্ট সময় পরপর শোনা যায়। যেমন ঘণ্টার শব্দ, শোঁ শোঁ বা গুনগুন শব্দ। এই শব্দ রোগীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং মনোযোগ নষ্ট করে। দীর্ঘদিন ধরে টিনিটাসে ভুগলে রোগীর মধ্যে হতাশা দেখা দিতে পারে।

দ্বিতীয় প্রকার হলো অবজেকটিভ টিনিটাস, যা রোগীর শরীরের ভেতর থেকে উৎপন্ন হয়। যেমন বায়ুপ্রবাহের শব্দ, ঘূর্ণায়মান রক্তপ্রবাহ, মাথার মাংসপেশির সংকোচন বা কানের ভেতরের মাংসপেশির সংকোচনের শব্দ। চিকিৎসক স্টেথোস্কোপ দিয়ে এই শব্দ শুনতে পারেন। তৃতীয় প্রকার হলো অডিটরি হ্যালুসিনেশন, যেখানে রোগী নির্দিষ্ট সময় পরপর কথা বলার শব্দ বা কোলাহল শুনতে পান, যা বাস্তবে নেই। এটি সাধারণত মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ থেকে উৎপন্ন হয় এবং মানসিক রোগীদের (যেমন সিজোফ্রেনিয়া) ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।

কানের কিছু অপারেশন যেমন টিমপেনোপ্লাস্টি বা টিমপেনোটোমির পরেও টিনিটাস দেখা দিতে পারে। কিছু ওষুধ যেমন কেটামিন, হেরোইন বা মারিজুয়ানার কারণেও এই সমস্যা হতে পারে।

টিনিটাসের কারণগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। কর্ণজনিত কারণে বহিঃকর্ণে কানের ময়লা বা খৈল, কেরাটোসিস অবটুর্যান্স, মধ্যকর্ণে অটোস্কেরোসিস, আটাইটিস মিডিয়া উইথ ইফিউশন বা পানি জমা, টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট ডিজঅর্ডার। অন্তঃকর্ণের রোগ যেমন মিনিয়ার্স ডিজিজ, শব্দদূষণজনিত বধিরতা, অটোটক্সিসিটি বা অন্তঃকর্ণের প্রদাহ। নিউরো অটোলজিক কারণে গ্লোমাস টিউমার, একসটিক নিউরোমা। এছাড়াও কানে আঘাত, উচ্চ রক্তচাপ, নিম্ন রক্তচাপ, হাইপোগ্লাইসেমিয়া ও মাইগ্রেনও টিনিটাসের কারণ হতে পারে।

রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। যেমন টিউনিং ফর্ক টেস্ট, পিউর টোন অডিওমেট্রি, টিম্প্যানোমেট্রি, এসআরটি, টোন ডিকে, বিইআরএ, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এক্স-রে অব ইন্টারনাল অডিটরি ক্যানেল, এক্স-রে মাস্টয়েড। রক্ত পরীক্ষায় রক্তের শর্করা, রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর ও অ্যান্টিনিউক্লিয়ার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হয়।

চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো রোগীকে বোঝানো যে এটি জীবন-সংহারী সমস্যা নয়। রোগের বিস্তারিত জানিয়ে রোগীকে চিন্তামুক্ত রাখতে হবে। শোঁ শোঁ শব্দের কারণ খুঁজে বের করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে। প্রয়োজনে হিয়ারিং এইড বা টিনিটাস মাস্কার ব্যবহার করা যেতে পারে। বালিশের পাশে অ্যালার্ম ঘড়ি বা বালিশের নিচে হালকা শব্দে রেডিও-মিউজিক চালিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কাত হয়ে কানের নিচে হাত রেখে ঘুমানো থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

অধ্যাপক এম আলমগীর চৌধুরী, ইএনটি বিভাগ, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা এই তথ্যগুলো প্রদান করেছেন।