সোমবার বিকেলে পাবনার ঈশ্বরদী শহরে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখা যায়। সাবেক ছাত্রদল নেতা জুবায়ের হোসেন ওরফে বাপ্পি (৩৫) শবাচ্ছাদনের পোশাকে শরীর ও মস্তক আবৃত করে হাতে একটি শটগান নিয়ে শহরের প্রধান সড়কগুলোতে পদযাত্রা করেন। প্রায় চার কিলোমিটার পথ ঘুরে তিনি থানার দিকে অগ্রসর হন। ওই সময় তোলা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
জুবায়েরের বাড়ি উপজেলা সদরের মশুড়িয়াপাড়ায়। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা হাবিবুর রহমানের অনুসারী হিসেবে তিনি পরিচিত। দলীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তিনি বিএনপির রাজনীতিতেই সক্রিয়। পরে তিনি তাঁর লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্রটি ঈশ্বরদী থানায় হস্তান্তর করেন।
এই ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপির অন্য একটি অংশ সোমবার রাতে থানার সামনে অবস্থান নেয়। পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বাধীন এই পক্ষটি বিক্ষোভ ও স্লোগান দিয়ে অস্ত্র প্রদর্শনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। রাত পৌনে আটটার দিকে সেখানে বক্তব্য রাখেন বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন, সাবেক পৌর যুবদলের আহ্বায়ক জাকির হোসেন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব মেহেদী হাসান।
বক্তারা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক বিরোধের কারণে জুবায়ের দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে শহরজুড়ে মহড়া দিয়ে তিনি আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিপক্ষকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই এই প্রদর্শন করেছেন বলে তাঁরা দাবি করেন।
থানার সামনে উত্তেজনা বাড়লে রাতের দিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঈশ্বরদী সার্কেল) প্রণব কুমার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশাদুর রহমান ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করেন। এরপর বিক্ষোভকারীরা সেখান থেকে চলে যান।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে এসে জুবায়েরের পক্ষে বক্তব্য দেন হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, জুবায়ের একজন প্রতিবাদী যুবক এবং তাঁর রক্তে প্রতিবাদের চেতনা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদী মাদক ও সুদের ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যার ফলে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ জানাতেই জুবায়ের কাফনের বস্ত্র পরিধান করে থানায় গিয়েছিলেন এবং নিজের অস্ত্রটিও সেখানে জমা দিয়েছেন।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও আইনজীবী মাসুদ খন্দকার প্রথম আলোকে জানান, জুবায়েরের পূর্ব পরিচয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন; তবে বর্তমানে তিনি দলের কোনো পদে নেই। অস্ত্র ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট আইন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সেই আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ওসি আশাদুর রহমান জানান, জুবায়ের থানায় এসে তাঁর অস্ত্রটি জমা দিয়েছেন। পুলিশ লাইসেন্স যাচাই করে দেখেছে যে এটি বৈধ। অস্ত্রটি থানার হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) আসনে সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদীতে বিএনপির দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান, যিনি ওই নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। অপর পক্ষের নেতৃত্বে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, যিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হওয়ার পর হাবিবুর রহমান পরাজিত হলে এই বিরোধ আরও গভীর হয়।




