চট্টগ্রামে সম্প্রতি আটক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের ১০ দিনের রিমান্ডের অনুমোদন দিয়েছেন আদালত। রোববার সকালে পৃথক একটি হত্যা মামলা এবং অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুতাসিম বিল্লাহ এ আদেশ প্রদান করেন।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ফটিকছড়ি থানার জামাল হত্যা মামলায় পাঁচ দিন এবং সম্প্রতি ফটিকছড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় আরও পাঁচ দিন— মোট ১০ দিনের রিমুন্ডের আবেদন করা হয়েছিল ইমনের বিরুদ্ধে। শুনানি শেষে আদালত উভয় মামলাতেই রিমান্ড আবেদন গ্রহণ করেন। পাশাপাশি, অস্ত্র উদ্ধার মামলায় মো. ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াস, শামীমসহ ইমনের চার সহযোগীকেও পাঁচ দিন করে রিমান্ড দেওয়া হয়েছে।

অপর এক ঘটনায়, হাটহাজারী বড়দিঘির পাড় এলাকায় ব্যবসায়ী জসীম উদ্দীনের নির্মাণাধীন ভবনে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির পুতে হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় ইমনকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট লোকমান হাকিম। সকাল থেকে আদালত প্রাঙ্গণে কড়া পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়েছিল। এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি আবু জায়েদ মুহাম্মদ নাজমুন নূর বলেন, শীর্ষ এ সন্ত্রাসীর রিমান্ড আবেদনের শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় গত বুধবার সকালে যশোর থেকে ইমন ও তাঁর তিন সহযোকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী এবং তাঁর বিরুদ্ধে ন্যূনতম ১৫টি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পরদিন বৃহস্পতিবার ইমুনকে আদালতে হাজির করিয়ে ফটিকছড়ি থানার হত্যা ও অস্ত্র মামলায় রিমান্ডের আবেদন করেছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।

পুলিশ সূত্র জানায়, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলীর হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনায় ইমন ছিলেন অন্যতম মূল নেতা, অপরজন হলেন মোহাম্মদ রায়হান। বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে সক্রিয় ৫০ জনের বেশি শুটার ও সহযোগী রয়েছেন। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদাবাজির জন্য ফোন করতেন ইমন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজ উদ্দিনকে তিনি ফোনে হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কথোপকথনে ইমন বলেছিলেন, '৫০০০ পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে ঢুকে মেরে ফেলব। তোর ভাইকে যেমন দশ হাজার মানুষের মাঝখানে গুলি করে মেরেছি।'

এ ধরণের ভয়ঙ্কর হুমকি—যেমন 'পরিবার গুলি গণনাও করতে পারবে না' বা 'সারা গায়ে গুলি করে ভোমরার বাসা বানিয়ে দেব'— দিয়ে বিদেশি নম্বর থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন ইমন। ১৩ জুলাই নগরের বাকলিয়ায় একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগও আছে তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এর দুদিন আগে ওই মালিকের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে 'ডেভিড ইমন' পরিচয় দিয়ে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং মাসিক দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। গ্রেপ্তারের আগে ২৫ জুলাই ফোনে এক সাংবাদিককে ইমন বলেছিলেন, 'আমার ছোটবেলার ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়া, না হলে বড়লোক হওয়া। বড়লোক হতেই এই পথে আছি।'

ইমন চট্টগ্রামের ফটিকখড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন, কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। স্থানীয়রা জানান, স্কুলজীবন থেকেই ইমনের ক্রিকেটের প্রতি আসক্তি ছিল। ফটিকখড়ি কলেজ মাঠে সাইকেল চালিয়ে অনুশীলন করতে যেতেন। পরে নগরের অক্সিজেন এলাকায় খালার বাসায় থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে। ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সংস্পর্শে এসে তাঁর দলে যোগ দেন। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তারের পর ইমুন হয়ে ওঠেন বড় সাজ্জাদের প্রধান সহযোগী। ২০২৫ সালে বাকলিয়ায় জোড়া খুন ও পতেঙ্গায় সন্ত্রাসী খাকাইয়া আকবর হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ইমনের সম্পৃক্ততা উঠে আসে। পুলিশ জানিয়েছে, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন এবং অস্ত্র চালনায় তিনি অত্যন্ত পটু।