আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে আত্মরক্ষাই একজন মুমিনের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইসলামি জীবনদর্শনে এমন কিছু কর্মকাণ্ডের কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো পালনে বান্দা আল্লাহর ক্রোধ থেকে নিরাপদ থাকতে পারে। হাদিসের ভিত্তিতে সে রকম পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আমল নিম্নরূপ—

ক্রোধ মানুষের মনে সবচেয়ে ক্ষতিকর আবেগগুলোর একটি। রাগের মাথায় মানুষ এমন সব উক্তি করে ফেলে, যা পরবর্তীকালে অনুতাপ সত্ত্বেও সংশোধন করা সম্ভব হয় না। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এমন কোনো কাজ কী যা তাঁকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা করবে? উত্তরে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তুমি রাগ করো না।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ২৯৬) আবুদ্দারদা (রা.)-কেও নবীজি (সা.) জান্নাতে প্রবেশের জন্য রাগ এড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। (আত-তাবরানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ২৩৫৩) ইসলাম রাগের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। সহিহ বুখারির হাদিসে (৬১১৪) রাগকে সংযতকারীকেই প্রকৃত শক্তিশালী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

মানুষের কাছে থাকা সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে গচ্ছিত সম্পদ। সেই সম্পদের একটি অংশ গরিব-দুঃখী ও বিপন্ন মানুষের কল্যাণে ব্যয় করলে তা আল্লাহর ক্ষোভ প্রশমনের কারণ হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সদকা প্রতিপালকের ক্রোধ প্রশমিত করে এবং অপমৃত্যু রোধ করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৬৪) সম্পদ হ্রাস পাওয়ার ভয়ে অনেকেই দান থেকে বিরত থাকেন। অথচ সহিহ মুসলিমের হাদিসে (২৫৮৮) উল্লেখ আছে, দান-সদকায় সম্পদ কখনো কমে না; বরং তাতে বরকত ও কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত হয়।

পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ ইসলামে আল্লাহর হকের পরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁদের সঙ্গে উত্তম আচরণ শুধু সামাজিক দায়িত্বই নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথও। হাদিসে এসেছে, ‘রবের সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং রবের অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯) পিতা-মাতার искренние দোয়া সন্তানের জীবনে এমন কল্যাণ বয়ে আনে, যা অর্জন করা কঠিন।

মানুষের প্রশংসা কামনা করা মানব স্বভাবের অংশ। তবে মুমিনের কাছে মানুষের স্বীকৃতির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিই শ্রেষ্ঠ। মানুষের ক্ষণিকের অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেছে নেওয়াই প্রকৃত বিজয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টি সহ্য করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং মানুষের মনেও তার জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। আর যে আল্লাহর অসন্তুষ্টি মেনে মানুষের সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং মানুষকেও তার প্রতি বিরূপ করে দেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৪)

সামান্য একটি কথা মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। একটি সতর্ক উচ্চারণ যেমন মর্যাদা বৃদ্ধি করে, তেমনি অসতর্ক বাক্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। তাই জিহ্বাকে সংযত রাখা নিছক সৌজন্য নয়, আখিরাতের সফলতার সঙ্গে জড়িত বিষয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা এমন একটি বাক্য উচ্চারণ করে, যাকে সে গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু আল্লাহ তা পছন্দ করেন এবং এর কারণে তার মর্যাদা বহু স্তর উন্নীত করেন। আবার বান্দা এমন একটি কথা বলে ফেলে, যাকে সে তেমন পাত্তা দেয় না, অথচ তা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয় এবং এর ফলে সে জাহান্নামে পতিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৮) অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে মুমিনের নীরবতাও ইবাদতের মর্যাদায় পৌঁছে যায়, যদি তা আল্লাহর অসন্তুষ্টির আশঙ্কায় হয়।