জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন— স্বৈরাচারের পতনের পর রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম বা গোত্রবাদ যেমন বেড়েছে, তেমনি সামগ্রিক রাজনৈনীতির বয়ান ডান দিকে সরে গেছে। পাশাপাশি উদার ও বাম মতাদর্শের রাজনৈনীতি প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক আয়োজিত ‘জুলাইয়ের অর্জন, জুলাইয়ের জিজ্ঞাসা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশিষ্ট শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তবে কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও জুলাইকে চূড়ান্তভাবে ‘ব্যর্থ’ বলতে নারাজ তারা।
সেমিনারে অংশ নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের তৎক্ষণাৎ লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটানো। সেই লক্ষ্য নিশ্চিতভাবেই অর্জিত হয়েছে। সরকারের পতন ও পলায়নের পর থেকে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং সংবাদ মাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস বর্তমানে স্থগিত রয়েছে।
সাংগঠনিক সক্ষমতার অভাবে বাম্পন্থীরা জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারিতে নির্ধারক ভূমিকা নিতে না পারলেও জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত্ত সংগঠিত ও কৌশলের সাথে পুরো আন্দোলনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করেছে বলে মন্তব্য করেন নূরুল কবীর। এমনকি অন্তবর্তী সরকারেও তারা নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছিল।
সেমিনারে মৌল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। তাতে উল্লেখ করা হয়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি সংকীর্ণ ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে এবং কে কতটা দক্ষিণপন্থীদের আকর্ষণ করতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে। এতে অন্তর্ভুক্তির অর্জন নেতিবাচক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ‘জামায়াতের জন্য দক্ষিণপন্থার বিস্তৃতি লাভজনক। এনসিপি জোটের কারণে নির্বাক, আর বিএনপির ভোটব্যাংক দক্ষিণপন্থী ঘেঁষা হওয়ায় তারাও এটিকে চ্যালেঞ্জ করছে না,’ বলা হয় প্রবন্ধে। একই সাথে জবাবদিহি মূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রচেষ্টা থমকে গেছে বলেও পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়। তবে সব সমালোচনার পরেও জুলাইকে ব্যর্থ বলে চিহ্নিত করা যাবে না। প্রবন্ধে পাঁচ করণীয় উল্লেখ করা হয়: সংস্কারকে এলিটদের দর-কষাকষির ঊর্ধ্বে জনপরিসরে ফিরিয়ে আনা, বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধের জায়গায় টেকসই সংগঠন গড়া, উদার-বাম শূন্যতা পূরণ করে রাজনীতিকে গোত্রবাদ থেকে বের করে আনা, জবাবদিহির প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং নৈতিক অর্থনীতির পথে যাত্রা।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের অধ্যাপক আহমাদ মোস্তফা কামাল মনে করেন, স্বৈরাচারী সরকারের পতন একটি উদযাপনযোগ্য সাফল্য। তবে চব্বিশের পর একটি ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে, যেখানে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা সরাসরি নেমেছে। তার মতে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ফ্যাসিবাদের সম্ভাবনা নির্মূল হলে ২০ বছর পর বুঝতে হবে যে অভ্যুত্থান কতটা সফল হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফার ভাষায়, জুলাইয়ের চেতনার বাস্তবায়ন দেখতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজের মাঝে ন্যায়বিচারের কর্মপদ্ধতি রচনায় নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। অপরদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুন জুলাইকে বুঝতে ও পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা হাজির করার ওপর জোর দেন।
লেখক ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতা ফিরোজ আহমেদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে দ্বি-মেরু বিভাজনে প্রগতিশীল রাজনীতি বন্দী ছিল, ফলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রবাদী শক্তির পূর্ণ ঐক্য হয়নি। প্রগতিশীলরা জনগণের সাথে থাকলেও আন্দোলনের সামনে আসার অবস্থানে ছিল না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের সতর্ক করে বলেন, জুলাইকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে শহীদদের প্রতি অবিচার হবে, আর তা সবার ক্ষতির কারণ। গত দু’বছরের ঘটনা ভুলে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যথায় নিপীড়নের সংস্কৃতি আবার ফিরে আসতে পারে।’ ডাকসুর সদস্য হেমা চাকমা উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের পর ডানপন্থার উত্থান ও ‘জনসন্ত্রাস’ ছিল কখনোই অভ্যুত্থানের কাঙ্ক্ষিত ফসল নয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের শিক্ষক ফাহমিদুল হক। আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, শিক্ষক ও গবেষক মোবাশ্বার হাসান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শরমি হোসেন, এবং বিএনপি নেতা মীর আরশাদুল হক প্রমুখ।




