প্রথম আলো ট্রাস্টের বিনামূল্যের মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভার ১৭৮তম আসর গত ২০ মে ২০২৬ রাজধানীর কারওয়ান বাজারের প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সভার বিষয় ছিল—‘ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়ার কার্যকর বা নিরাপদ বিকল্প নয়’। সভায় পরামর্শ প্রদান করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল। সম্প্রতি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অনেকেই মনে করেন এটি সাধারণ সিগারেটের তুলনায় কম ক্ষতিকর। কিন্তু বিশেষজ্ঞের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিপজ্জনক।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, শুরুতে ই-সিগারেটকে ধূমপান ছাড়ার বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরা ধূমপান ছাড়তে পারছেন না বরং ‘ডুয়াল এডিকশন’ বা দ্বিগুণ আসক্তিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ই-সিগারেটের ভেতরে থাকা নিকোটিন, প্রোপাইলিন গ্লাইকল, ভেজিটেবল গ্লিসারিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উত্তপ্ত হয়ে বাষ্পে পরিণত হয় এবং সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে। এতে নিকেল, সিসা, ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর কণাও থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে।
ই-সিগারেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের গুজব প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ০.২ শতাংশের বেশি সিসা থাকা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইতোমধ্যে ০.২৫ শতাংশের বেশি সিসা পাওয়া বহু সিসা কেন্দ্র ব্লক করা হয়েছে, যা রেড অ্যালার্ট হিসেবে গণ্য। ফলে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে এবং কঠোর নজরদারি অব্যাহত আছে।
চেম্বারে আসা তরুণ রোগীদের অবস্থা বর্ণনা করে ডা. কামাল বলেন, প্রতিদিনই এমন রোগী আসছেন যাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভয়াবহ। একজন মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে এসে কাঁদছিলেন—ছেলেটির চোখ কোটরে বসে গেছে, চেহারা মলিন, রাতে ঘুম হয় না, পড়াশোনায় মনোযোগ নেই। এগুলো সবই ভ্যাপিং বা মাদকের সরাসরি ফল। তরুণরা অজ্ঞতা ও বন্ধুদের প্রভাবেই এই মরণফাঁদে পা দিচ্ছে। তারা ভাবে এটি শুধু একটি ডিভাইস, কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু বাস্তবে কিছু অসাধু চক্র লিকুইডের সাথে ইয়াবা বা উদ্দীপক ড্রাগ মিশিয়ে দিচ্ছে, ফলে সন্তানরা অজান্তেই গভীর সংকটে পড়ছে।
ফুসফুসের ওপর প্রভাব সম্পর্কে অধ্যাপক কামাল ব্যাখ্যা করেন, ভ্যাপিংয়ের কারণে বিশ্বজুড়ে ‘ইভেলি’ (EVALI) নামে নতুন রোগ ছড়াচ্ছে, যা ই-সিগারেট বা ভ্যাপিং পণ্য ব্যবহারজনিত ফুসফুসের আঘাত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকার সিডিসি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। রাসায়নিক বাষ্প ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেয়।
মোবাইল আসক্তি ও টিকটকের মতো ডিজিটাল আসক্তির সঙ্গেও মাদকের তুলনা টেনে তিনি বলেন, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, টিকটক বা গেমিং আসক্তিতেও মাদকের মতোই ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যা ‘নেট অ্যাডিকশন’ নামে মানসিক রোগের জন্ম দেয়। এর ফলেও শিশুদের পড়াশোনা ও মেধা ধ্বংস হয়।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. কামাল কয়েকটি পদক্ষেপের পরামর্শ দেন: সন্তানদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বাড়াতে হবে, ছোট ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। বাড়িতে ক্যারামবোর্ড, ইনডোর গেমস, ব্যাডমিন্টনের মতো সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পারিবারিক লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে যাতে বইয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে কেমিক্যাল টেস্ট ও বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে যাতে শিশুরা ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়।




